মহা-সৌরভ-রাজ
ইন্দ্রনীল দত্ত
টুকরো টুকরো সেই ছবিগুলো এখনও অমলিন। ভেবে দেখলে তা কোনদিনই হারিয়ে যাবে না স্মৃতির ধূসর পাণ্ডুলিপির ধুলোয়। তা হারিয়ে যেতে পারে না।
নাগপুরের প্রাইড হোটেলের গোটা চত্ত্বর জুড়ে শুধু ভিড় সংবাদমাধ্যমের। একদিকে নিরাপত্তার বাড়াবাড়ি রকমের ব্যস্ততা, অন্যদিকে তাঁর বিদায় বেলার সঙ্গী হতে প্রচুর মানুষের ঠাসা ভিড়। একবার, শুধু একবারের জন্য কী সাক্ষাৎ মিলবে না তাঁর? খুব কাছে যেতে না পারলেও ভিড়ের ভিতর ঠেলেঠুলে এগিয়ে গিয়ে বাড়িয়ে দেওয়া খাতা।। একটা সই, ওটাই অতি যত্নে তোলা থাকবে ব্যক্তিগত সংগ্রহে। লোককে বড় মুখ করে বলা তো যাবে,‘এই দ্যাখ, সেই মানুষটার হস্তাক্ষর যে কীনা সারাটা সময় জুড়ে শুধু অসম্ভবের সঙ্গে লড়াই করে তাকেই ফেলে দিয়েছিলো চরম লজ্জায়!’
অনেকের সঙ্গে সেই মুহূর্তের সঙ্গী হওয়ার সুযোগ হয়েছে এই প্রতিবেদকেরও। পেশাদারী মানসিকতা বারবার করে বলে যাচ্ছে যেভাবেই হোক পত্রিকার জন্য পাঠাতে হবে বিশেষ সাক্ষাৎকার, অন্যদিকে মনের ভিতর কোথায় যেন কিছু একটা হারানোর তীব্র যন্ত্রণা! সবকিছুকে সংযমের আগড়ে বেঁধে হোটেলের রিসেপশন থেকেই মোবাইলে ফোন,‘দাদা, আমার নম্বর কখন আসবে’? প্রশ্নের বহর শুনে উল্টোপ্রান্ত থেকে ভেসে এলো হালকা হাসির রেশ,‘আরে, সোজা চলে এসো স্যুইমিং পুলের ধারে। গোটা ভারতবর্ষকে সামনে নিয়ে বসে আছি, তুমিও চলে এসো। বাংলা বরাবর আমার কাছে এক নম্বরে’! তড়িঘড়ি করে সেখানে পৌঁছে চোখে পড়লো সত্যিই এক বিরল দৃশ্য। আক্ষরিক অর্থে মিনি ভারতবর্ষের ছবি। সার দিয়ে বসে দেশের প্রায় সব প্রান্ত থেকে উড়ে আসা সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা। তিনি এক এক করে সবার সামনে হাজির হচ্ছেন। কোন বিকার নেই, নেই বিরক্তির ছোঁয়া। পরিচিত হাসি ধরে রেখে ঠায় জবাব দিয়ে চলেছেন বহু ব্যবহারে ‘ক্লিষ্ট’ সেই প্রসঙ্গগুলোর যা তাঁকে সববসময় ধাক্কা দিয়ে গেছে ভিতরে ভিতরে!
‘দাঁড়াও, আগে ওদেরটা আগে সেরে ফেলি, বাংলার জন্য বিশেষ সময় বের করে রেখেছি। আর তো কটা মুহূর্ত, তারপর কে, কতোবার আমার কাছে আসবে, ঢের জানা আছে। ভাবতে পারো, এরাই একদিন আমার মুণ্ডুপাত করে বলছিলো ভারতীয় ক্রিকেটকে বাঁচাতে আমাকে ঘাড় ধরে বের করে দিতে হবে।আজ ওরাই আবার সব ভালো মুখ করে, সমবেদনা প্রকাশ করে ঠায় বসে একটা কথা শোনার জন্য। সত্যি, কতো অভিজ্ঞতাই না হলো!’
হ্যাঁ, ইনিই সৌরভ ‘মহারাজ’ গাঙ্গুলি। ভারতীয় ক্রিকেটের ‘মহাদাদা’। প্রাদেশিকতার সংকীর্ণ প্রাদুর্ভাবকে হেলায় দূরে সরিয়ে ভয়ঙ্কর তেজে উদ্ভাসিত এমন এক চরিত্র যাঁর বহুমুখীতা নিয়ে অনায়াসে চলতে পারে এক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা। শুধুই কী ক্রিকেট? তার বাইরে পড়ে থাকা বিশাল প্রান্তরে লুকিয়ে থাকা হাজারো পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বেড়ে ওঠা এক এমন আগুন যার ছোঁয়ায় প্রথাগত সব ভাবনাগুলো জ্বলেপুড়ে একাকার হয়ে জন্ম হয়েছে এমন এক মানসিকতার যা বলতে শিখিয়েছে, লোকে কী বলছে তার থেকে অনেক বেশি মূল্যবান আমি নিজে কী ভাবছি। হ্যাঁ, কোথায় যেন সেই বহু প্রজন্ম আগে বিশ্বের বুক চিরে উঠে আসা সেই মানুষটার মতো যাকে দুনিয়া জানতো কেসিয়াস ক্লে’র নামে,‘পৃথিবী আমাকে যেভাবে চায়, আমাকে তা হতে হবে কেন? পরের শৃঙ্গটা কী হবে সেটা আমিই ঠিক করবো’! সৌরভ গাঙ্গুলি ভারতীয় তথা বিশ্বক্রিকেটের সেই ‘অভিজাত, বহুমাত্রিক বৈশিষ্টে ভরপুর এক বর্ণময় মুখ’। না, এ আমার, আপনার মনগড়া কোন উপমা নয়, এমনভাবেই বড় আদরের ‘দাদি’কে ব্যাখ্যা করেছেন ভারতীয় তথা বিশ্ব ক্রিকেটের আরেক শৃঙ্গের অধিপতি সুনীল গাভাসকার! এবং যাঁকে নিয়ে পাতার পর পাতা অনায়াসে লিখে ফেলা যায়, আবার কিছু ঘটনাকে রকাশ্যে আনা যায় না বিতর্কের চক্র এড়িয়ে যেতে।
তাহলে আজ কী মূল্যায়ণে বর্ণিত হবে এমনই এক চরিত্রের। তিল তিল করে সযত্নে লালিত সেই ক্রিকেটীয় বাসনা যা সেইসব মানুষদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিয়ে যায়, যে বঞ্চনা তাঁদের প্রতি করা হয়েছে তার অনায়াস জবাব দেওয়া সম্ভব। প্রবল এক আত্মপ্রত্যয়ের চোখ ঝলসানো বিচ্ছুরণে সেই নিন্দুকদের রাতারাতি অন্ধ বানিয়ে দিয়ে নিজেকে তুলে ধরা যায় এক সু-উচ্চ শিখরে যার দিকে মাথা তুলে তাকাতে গেলে কোথায় যেন থেমে যায় দৃষ্টি। শেষ অবধি নজর গিয়ে আর পৌঁছায় না! সেই হার না মানা মেজাজটাই সৌরভ গাঙ্গুলি নামক এক মানুষের গোপন রসায়ন। শুধু ক্রিকেটীয় শৃঙ্গজয় বলেই নয়, পাশাপাশি ভারতীয় ক্রিকেটকে আঞ্চলিকতার হাত থেকে টেনে বের করে এনে হাজির করেছিলেন এমন কিছু মুখের সারি , আজ যাদের ভিতর সবাই দেখতে পাচ্ছেন ‘নতুন ভারতের’ ছোঁয়া। মাহীন্দ্র সিং ধোনি অথবা যুবরাজ সিং, বীরেন্দ্র সেওয়াগ অথবা জাহির খান, হরভজন সিং অথবা সদ্য সাড়া জাগানো ঈশান্ত শর্মা। সৌরভেরই হাত ধরে কোন না কোন সময়ে এমনভাবে এই নামগুলির আত্মপ্রকাশ যার ‘প্রথম শো’ আদৌ হিট করবে নাকি নিখাদদ এক ‘ফ্লপ শো’র আকার নেবে, একটা সময় সেটাই ছিলো সবার আলোচ্য। কিন্তু ওটাই সৌরভ গাঙ্গুলির চ্যালেঞ্জ। দল তৈরি হবে অথচ তাকে দেখে মনে হবে কেউ দয়া করে তা হাতে তুলে দিয়েছে, সেটাই বা কী করে হজম করে নেবো অধিনায়ক হয়ে? ফলে ওই বহুদিন ধরে চলে আসা প্রাদেশিকতার লেবেল লাগানো দলের তকমা মুছে ফেলে হাজির করতে হবে একদল এমন সমস্ত দামাল ছেলেদের যাদের মাঠের ভিতর সামলাতে নাভিশ্বাস উঠে যায় প্রতিপক্ষের। স্টিভেন রজার ওয়া’র মতো লৌহকঠিন মানবও স্বীকার করে নিয়েছিলেন,‘বাপ রে! একটা দল করেছে বটে! নিজেও যেমন ডাকাবুকো, সঙ্গীগুলোকেও সেই ছাঁচে ফেলে একেবারে তপ্ত লোহাতে পরিণত করেছে। যাবে, এই ভারতীয় দলটা বহুদূর যাবে’।
কতো কীই না ঘটে! সামগ্রিকতার বিচার করতে বসলে সৌরভ গাঙ্গুলির পরিপূর্ণতা এবং প্রাপ্তি খুব সম্ভবত বাকিদের তুলনায় অনেক, অনেক বেশি। সেই ভারতীয় ক্রিকেটের অন্দরে প্রথমপ্রবেশের সময় থেকে শুরু করে বিদায়বেলাকার বিষণ্ণতা, সব জায়গাতেই সৌরভ একাই একশো!
সেই ত্রিনিদাদের চড়চড়ে রোদে একা গ্যালারিতে বসে থাকা। বাংলাদেশের কাছে প্রথম ম্যাচে হেরে ভারত কার্যত বিদায় নেওয়ার দুঃপ্বপ্ন দেখতে শুরু করে দিয়েছে। গোটা ভারতীয় দল অনুশীলনে ব্যস্ত, সৌরভই শুধু বসে গ্যালারিতে। ওই চ্যাপেল রাজেরই অনুশাসনের ফল! এখনও কানে বাজে সৌরভের সেই মন্তব্যটা,‘তোমরা হয়তো সেভাবে বিশ্বাস করতে পারছো না তবে আমার মন বলছে এবার আমরা খুব তাড়াতাড়ি এখান থেকে বিদায় নেবো। হয়তো বা প্রাথমিক পর্ব থেকেই!’ আনমনে, বিড় বিড় করে বলে যাওয়া সেই কথাগুলোর ফাঁকে মহারাজের দু’চোখে অপার শূণ্যতা কোথায় যেন ধাক্কা দিয়ে গেছিলো আমাদের মতো গুটিকয় বাংলার সাংবাদিকদের চেতনায়।‘আসলে দলটা তো অখণ্ড মেজাজ নিয়েই আসতে পারেনি। প্রত্যেকে একেকটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের আকার নিয়ে এখানে খেলতে এসেছে। বিশ্বকাপের মতো আসরে সেই বিচ্ছিন্নতাকে কে প্রশ্রয় দেবে!’ ভারতের করুণ বিদায়ের পর চ্যাপেলও বলে ফেলেছিলেন, ওটা কোন দলই ছিলো না! বেহালার বীররেন রায় রোডের বাড়িতে বসে সৌরভ বলে উঠেছিলেন,‘কী মিলে গেলো তো!’
আবার এবারই অস্ট্রেলিয়াতে একদিনের দল থেকে বাদ পড়ার পর গোটা ভারত জুড়ে সোরগোল। এ কী করলো ধোনি? জানাই ছিলো, ধোনি এবং পারিষদরা তার বহু আগে থেকেই ‘দাদা’কে একদিনের দল থেকে বাদ দেওয়ার জন্য মরিয়া প্রয়াস শুরু করে দিয়েছে। ব্রিসবেনে বসে সৌরভ নিজেই অনুরোধ জানয়েছিলেন, শুধুমাত্র ওই একদিনের সিরিজটাতে খেলতে এবং তারপরেই নিজেই ঘোষণা করে দিতেন একদিনের ক্রিকেট থেকে সরে যাওয়ার কথা। আই পি এল’য়ে চেন্নাইতে ম্যাচ ধোনির বিরুদ্ধে। জিজ্ঞাসা করেছিলাম,‘এবারই তাহলে ওকে জবাব দেওয়ার কাজটা সেরে ফেললে হয় না!’ সৌরভ কেমন যেন অবাক হয়ে গেলেন,‘তোমরা বারবার করে মাহীকে কেন খলনায়ক বানিয়ে ফেলছো?আমি কী জানিনা, ওর কিছু করার নেই, ভারতীয় ক্রিকেটের মাথায় যাঁরা বসে রয়েছে তাঁরাই তো সবকিছু ঠিক করে রেখেছে আমাকে বিদায় জানানোর জন্য। মাহী তো তার উপলক্ষ্য মাত্র। ছেলেটা ধোনা না হয়ে রাম, শ্যামও হতে পারতো! মাহী কিন্তু লম্বা রেসের ঘোড়া, বহুদূর নিয়ে যেতে পারবে ভারতীয় ক্রিকেটকে’।
নানা সময়ে ভিন্ন আঙ্গিকে নিজেকে মেলে ধরা এমনই সৌরভ গাঙ্গুলির গভীরতা মাপতে যাওয়া বিশাল এক বোকামি। এতো পাকা এবং গভীর এবং স্বচ্ছ ক্রিকেটবোধ খুব কমই পেয়েছে পঁচাত্তর বছরে পা রাখা ভারতীয় ক্রিকেট। মনে আছে, মোহালিতে সৌরভের খেলা দেখতে আচমকা হাজির ভারতীয় ক্রিকেটের আরেক ডাকসাইটে ব্যক্তিত্ব মনসুর আলি খান পতৌদি বলে উঠেছিলেন,‘ছেলেটার ভাবনার তারিফ করতে হয়।মুহূর্তের ভিতর কীভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হবে, তা অনায়াসে শুধু ভাবেই না কাজেও তা লাগিয়ে দেয়। একেকটা সময় মনে হয়, আমার সময়েও যদি ওর মতো এমন একটা ছেলেকে পেতাম..!’ পাশে বসা ‘বিবি’ শর্মিলা ঠাকুরের সহাস্য মন্তব্য ছিলো,‘আরে বাবা, ঘরানাটা দেখতে হবে তো। হাজার হোক বাঙালির রক্ত লুকিয়ে রয়েছে। তার তেজই আলাদা!’
গড়পড়তা বাঙালীর মনে যে বিশ্ব জয় করার স্বপ্ন অহরহ জন্ম নেয় এবং তা মিলিয়ে যেতেও খুব সময় নেয় না, সৌরভ গাঙ্গুলি সেই ‘দুঃসাহসী, কল্পনাবিলাসী’ জাতির সেরা আইকন, যিনি কীনা বুঝিয়ে দিয়েছেন ওই মান্ধাতা আমালের ভাবনার কোন জায়গাই নেই আজকের এই রাস্তায়। ভারতীয় ক্রিকেটে ‘আমচি মুম্বাই’ তো এখনও শীর্ষে। খেলতে পারো ছাই না পারো, মুম্বাই থেকে উঠে আসার অর্থ প্রচণ্ড লড়াই করার মানসিক শক্তি নিয়েই সেই মুখের আবির্ভাব ঘটেছে। সে তুলনায় বাঙালীর ছেলে মানেথ তো মাথার ওপরে বল উঠলেই বাড়ির লোকের কথা মনে পড়ে যায়! সৌরভ এমনাভবে সেই প্রথাটা ভাঙলেন যার ভাষায় ব্যাখ্যা চলে না! এক অনুপ্রেরণা উদ্রেককারী চরিত্র যে কীনা প্রতিমুহূর্তে যে কোন ধরণের প্রতিকূলতার সঙ্গে সমানে সমানে লড়াই করতে তৈরি। এবং পাশে থাকা বাকিদের ভিতরও সেই মন্ত্র মগজে ভরে দিতে খুব একটা পরিশ্রমও করার প্রয়োজন অনুভব করেননি। প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে সেই অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করাটা এমন এক স্বভাবের আকার নিয়েছিলো যা বাকি সবাইকে ‘অন্যকিছু’ ভাবার জন্য বাধ্যই করে দিয়েছিলো। এবং প্রতিবারই বাজি জিতেছেন তিনিই!
ইতিহাস কতো কথাই না বলে! শোনা যায়, বাংলার বড়লাট লর্ড কার্জন নাকি বলেছিলেন,‘বাঙালির সাহস খরগোশের মতো আর বুদ্ধি গ্রিকদের মতো’! খুব স্বাভাবিকভাবেই বাংলা ভাগ করে ফেলার কারিগর প্রশংসা করে তেমন মন্তব্য করেননি। ‘দাদাগিরি’ ওখানেই প্রথম হেনেছিলো আঘাত। তবে সেটার শুরু তো সেই ১৯৯২ সালে, যখন কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি বেহালার বীরেন রায় রোডের এক বে-পরোয়া যুবকই একদিন ভেঙেচুরে একশা করে দেবেন ভারতীয় ক্রিকেটের মরচে পড়ে যাওয়া কাঠামো! মহাতারকাদের ভিড়ে বসে থাকা সেই প্রথম সফরেই আজহারদের ম্যানেজার রনবীর সিং মাহীন্দ্র বলেছিলেন মাঠে গিয়ে জল দিয়ে আসতে। ফোঁস করে উঠেছিলো প্রতিবাদসুলভ মনটা,‘জল বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভারতীয় দলে আসিনি। আমি কলকাতার মহারাজ’! ঘটনাটা এখন সঙ্গত কারণেই এড়িয়ে যান সৌরভ কিন্তু সেটাই ছিলো এক অতি-মানবিক চরিত্রের আগমনী বার্তা! ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো সেই সীমাহীন উদ্যম, উদ্ধত ক্রিকেটদর্শন, প্রতিভাদের খুঁজে বের করে তাদের সযত্নে লালন করার মমতা ভরা দৃষ্টি এবং নিজের তথা সঙ্গীদের প্রতি নিরবিচ্ছিন্ন বিশ্বাসবোধ। রাতারাতি পালটে গেলো ভারতীয় ক্রিকেটের ম্যালেরিয়া সুলভ কম্পন এবং নুইয়ে পড়া অবসাদের ঘোর। সৌরভের নিজের কথা ধার করে বলতে গেলে,‘শচীনকে বাদ দিলে ভারতীয় ক্রিকেটে বাকি সবাইকেই ছাপিয়ে যেতে পারি, সেই বিশ্বাস আমার ছিলো শুরু থেকেই। পরে ক্রমে বুঝলাম বাংলা থেকে খেলতে যারা আসে তাদের প্রতি শিবিরের ভিতরেই কোথায় যেন একটা শূণ্যস্থান থাকেই এবং সেখান থেকেই ওই আঞ্চলিকতার তত্ত্ব আরো জোরালো হয়ে পড়ে। ঠিক করে নিলাম, এমন একটা দল বানবো যাদের পোশাকের তলায় লোকানো থাকবে এ কে ৪৭, মুখে থাকবে অবিশ্রাম বুলি আর চোখে চোখ রেখে ভয় পাইয়ে দেওয়ার সাহস। এই দাদাগিরি না চালালে খুব মুশকিল!’
দাদাগিরি! না, সেটা বড় ‘খেলো’ হয়ে যায়। বলা ভালো, এমন এক উদ্ধত শাসক হাজির হয়েছিলেন যার পায়ের শব্দে ঘুম ছুটেছে বহু রথী, মহারথীর। এক অদ্ভুত দ্বৈতসত্তা নিয়ে সৌরভ গাঙ্গুলি রাজ করে গেলেন ক্রিকেটকে। কখনও খুব চেনা, অতি আদরের, প্রচুর ভুলে ভরা একটা আড্ডাবাজ ছেলের মেজাজ। আবার সেই রূপটাই একলহমায় বদলে যাচ্ছে বাইশ গজের ওই জমিতে পা রাখার পরেই। সেখানে পড়ে জবাব দেওয়ার হাজারো সব প্রেক্ষিত এবং হরেক সব বহুরূপীদের সার দিয়ে অপেক্ষায় থাকার মুহূর্ত। তাঁর আগে অনেকেই এসেছেন, লিখে গেছেন অনেক কাহিনী কিন্তু গল্প হিসাবে তার জনপ্রিয়তা অথবা প্রাসঙ্গিকতা ঠিক কতোখানি ছিলো সেই বিচার করার লোকেরই ছিলো অভাব। সৌরভ কিন্তু খুব কর্কশভাবেই তিনিই, ভালো সময়ে এবং খারাপ সময়েও। ওই যে কথায় বলে না, ‘মুরোদ’ থাকা চাই, ওটাই সতীর্দের পাশাপাশি ভারতীয় ক্রিকেটকেও নতুন করে শিখিয়ে দিলেন দাদা। ম্যাচ গড়াপেটার গাড্ডায় পড়ে নাভিশ্বাস তুলতে থাকা ভারতীয় ক্রিকেট যে আবারও ফিরে আসতে পারবে এবং এমন সাড়ম্বরে তা জেন কেউ ভাবনার ভিতরেই আনতে পারেননি। এক অদ্ভুত নিরাপত্তাহীনতা, সাঙ্ঘাতিক এক লোভের হাতছানি, রাশিকৃত বিতর্কের অনবরত তাড়া করে ফেরা। সেই প্রচণ্ড দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে সবাইকে টেনে বাইরে বের করে এনে সৌরভই দেখিয়ে দিলেন নতুন নিশানা। একটা রণহুঙ্কার, এবং তা ক্রমে এক বিশাল উচ্চতায় গিয়ে গিলে ফেললো বাকি সবকিছুকে।
একটা ভাবনা, একটা প্রতিবাদ, আর বিস্তর সব লড়াই। নিজেকে চেনানোর পাশাপাশি তাঁর সঙ্গে থাকা সতীর্থদেরও তুলে ধরা ভিন্ন এক আঙ্গিকে। সৌরভ গাঙ্গুলির বিদায়ের পর আবার তা দেখা যাবে তো! গোটা একটা দল একই মনস্তত্ত্বে বিশ্বাস করে উড়িয়ে দিচ্ছে যে কোনধরণের প্রতিরোধ, পায়ের কাছে এসে নতজানু হয়ে পরাজয় স্বীকার করে নিচ্ছে তাবড় দলের তাবড় নায়করা। সেই ছবিটা আবার ফিকে হয়ে যাবে না তো! হোক বা না হোক, সেই সুগন্ধটা বোধহয় আর ফিরে পাওয়ার নয়। করাচিতে পাকিস্তানকে টেস্ট সিরিজে ঘায়েল করে হোটেলের লবিতে ঢুকে সৌরভ গাঙ্গুলি হুঙ্কার ছেড়েছিলেন,‘মুগাম্বো আব খুশ হুয়া!’ হাজির হোটেলের আধিকারিকরা পর্যন্ত এসে সেই হুঙ্কারে গলা মিলিয়েছিলেন! অথবা বেঙ্গালুরুতে প্রবল নিরাপত্তার ধাক্কায় ভিড়ের ভিতর পড়ে যাওয়া এক বছর আষ্টেকের ছোট্ট মেয়েকে কোলে বসিয়ে অটোগ্রাফ খাতায় পরপর সই দিয়ে যাওয়ার পরিতৃপ্তি ( পরে যা নিয়ে বলেছিলেন, ওকে দেখে আমার মেয়ে সানার কথা মনে পড়ে গেলো। সানা ওইভাবে পড়ে গেলে আমি কী হাতে হাত দিয়ে বসে থাকতাম!)। না, খুব সম্ভবত সেই অমলিন মুহূর্তগুলোকে এখন শুধু নীরবে স্মরণ করে যাওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোন উপায়ই নেই!
নাগপুরে শেষ টেস্টের সময়েই একদিন আড্ডার ছলে প্রশ্ন করেছিলাম,‘ওই ১৯৯২ সালের পর আর ভারতীয় দলে জায়গা না পেলে কী করতেন’? সপাটে জবাব,‘কেন! ব্যবসায়ী হতাম’। কিসের ব্যবসা? সামান্য চিন্তা করে হাসতে হাসতে জবাব দিলেন,‘কাপড়ের ব্যবসায়ী হতাম। ইস! তাহলে তোমাদের সঙ্গে দেখাও হতো না, তোমরাও কেউ আসতে না আমার কাছে’! যদি তাই হতো, ভারতীয় ক্রিকেট কী হারাতো তার গতি? বড় কঠিন হয়ে গেলো বোধহয় প্রশ্নটা। তার থেকে ওই কেসিয়াস ক্লে’র কথাটাই আরো একবার উচ্চারণ করা ভালো,‘পুনরাবৃত্তি যদি দৃঢ়তার সঙ্গে করা যায়, তার থেকে জন্ম নেয় এক বিশ্বাস। এবং সেই বিশ্বাসে যখন জন্ম নেয় প্রত্যয়, তখনই ঘটনার শুরু’।
দাদা একচুলও নিজের বিশ্বাস থেকে নড়েননি। দাদা কিন্তু বাজি জিতেই বেরিয়ে গেলেন!
Tuesday, January 26, 2010
violence in sports
আত্মঘাতী সবুজ সুষমা
ইন্দ্রনীল দত্ত
‘Serious sports has nothing to do with fair play. It is bound up with hatred, jealousy, boastfulness, disregard of all rules, and sadistic pleasure in witnessing violence: in other words it is war minus the shooting!’ - George Orwell
৩রা মার্চ, ২০০৯। সাতসকালেই যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার যোগাড়। তামাম বিশ্বের টেলিভিশন চ্যানেলের লক্ষ্য লাহোর। তামাম বিশ্বের ক্যামেরার সুক্ষ চোখ তখন একনাগাড়ে ঘুরে চলেছে ফুলের শহরের পাথুরে রাস্তায়।
বিশাল আকারের এক বাস দাঁড়িয়ে। জানলার কাঁচে গুলির বড়সড় সব ফুটো। একপাশ দিয়ে ছুটে চলেছে নিরাপত্তারক্ষীর দল। হাতে তাদের খোলা কালাসনিকভ।ঠিক উল্টোপ্রান্তে ক্যামেরা ঘুরতেই যেন আতঙ্কের হিমেল স্রোত নেমে গেলো মেরুদণ্ড দিয়ে। মুখে জড়ানো কালো কাপড়। জনাতিনেক অজ্ঞাতপরিচয় মানুষ একতরফা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে দৌড়াচ্ছে। বারুদ আর আগুনের ধোঁয়ায় চারপাশে কেমন যেন মৃত্যুরই আনাগোনা।
গদ্দাফি স্টেডিয়ামে যাওয়ার পথে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলের ওপর আচমকা নেমে আসা ভয়ঙ্কর এক সন্ত্রাসবাদী হামলা। একেবারে লাইভ টেলিকাস্ট! কারা,কেন এই ক্রিকেটারদেরই বেছে নিলো নিকেষ করার মতলব এঁটে তা জানার তখনও কোনরকম উপায় নেই।
ক্যামেরা আবার ঘুরছে।কংক্রিটের মসৃণ রাস্তায় পড়ে কিছু লাস।রক্তাক্ত,বীভৎস, খণ্ড হয়ে যাওয়া কিছু মাংসপিণ্ড। কাদের লাশ? কাঁপতে কাঁপতে টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিনিধিদের গলা থেকে বেরিয়ে আসছে যতোটুকু কথাবার্তা তার মর্মার্থ উদ্ধার করে জানা গেছে, রয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু অকুতোভয় জওয়ান যাঁরা কীনা জীবনের পরোয়া না করেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বিশ্বের সেরা ক্রিকেট তারকাদের প্রাণ বাঁচাতে, অথচ নিজেরাই হারিয়ে গেলেন মুহূর্তে! আবার রয়েছে কিছু নিরপরাধ আমজনতারও শরীরের খণ্ডাংশ। ওঁরা বোধহয় ঠিক হামলার মুহূর্তে নিজেকে বাঁচাতে শেষ চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু পারেননি গুলির গতিবেগের সঙ্গে পাল্লা দিতে। উগ্র হিংস্রতার শিকারে সবকিছু তালগোল পাকিয়ে একাকার!
মোনা রানার সঙ্গে পরিচয় ১৯৯৯ সালে। দীর্ঘ অনিশ্চয়তার জাল কেটে পাকিস্তান ক্রিকেট দল খেলতে এসেছে ভারতে। প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচ গোয়ালিয়রে। তো স্টেশনে পা রেখে চক্ষু চড়কগাছ। থিকথিক করছে পুলিস আর বিশেষ নিরাপত্তারক্ষী।থমথমে চোখমুখ, যেন দাঙ্গা বেঁধেছে গোটা শহর জুড়ে।ফিসফাস শব্দ আর হরেক গুঞ্জন। ক্যাপ্টেন রূপ সিং স্টেডিয়ামের পরিবেশ দেখলে ভয় যেন আরো চেপেই বসে। বিশালাকৃতি সব কুকুর দিয়ে চলছে জোরদার তল্লাশি, এবং তারপরেও শেষ হচ্ছে না তল্লাশি। সমস্ত জিনিসপত্র খুলে, ছুঁড়ে দিতে কসুর করছে না পুলিস। এমনই এক আবহে মোনার সঙ্গে আলাপ।
বয়স মধ্য তিরিশ, বি বি সি’র লাহোর সংবাদদাতা মোনারও সেই প্রথমবার ভারতে পা রাখা। মহিলা বলে ছাড় নেই। হয়তো বা ওয়াঘার ওপার থেকে আসার কারণে তল্লাশির মাত্রা একটু বেশিই। চোখমুখ ছলছলে,‘একটা সময় তো গোটা দেশটাই ছিলো অবিভক্ত। আর আজ সেটা দুটো টুকরো হয়ে যেতেই এতো বৈপরীত্য!’ অনেকটা সেই হিন্দি ছবির আবেগঘন মন্তব্যের মতো কানে বেজেছিলো মন্তব্যটা। যাই হোক, সেই প্রসঙ্গে দ্বিতীয়বার না ঢুকে ধীরে ধীরে বেড়েছে পরিচয়। দরকারেই টেলিফোন করে খবর যোগাড় করতে দ্বিধাবোধ হয়নি।
৩রা মার্চের সন্ধ্যায় আবার টেলিফোন লাহোরে। প্রায় আধঘন্টা চেষ্টার পর লাইন যখন মিললো মোনার গলায় অদ্ভুত এক আতঙ্কের ছায়া,‘দোস্ত, হামলোগ বরবাদ হো গয়ে’! ততোক্ষণে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়ে গেছে সেই হামলার পিছনে থাকা চক্রের নাম নিয়ে বিবিধ পর্যালোচনা। লস্কর ই তৈবা গোষ্ঠীর সক্রিয় আক্রমণেই শ্রীলঙ্কা দলটাই প্রায় মরতে বসেছিলো। মোনাকেও প্রশ্ন করে যে ব্যাখ্যা মিলেছিলো তা বহু পরিচিত বীজগণিতের ফর্মূলার মতো। অতীতে হরকত উল আনসার গোষ্ঠীর সঙ্গে এল টি টি ই’র ভালো সম্পর্ক ছিলো। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে টাইগাররাই এবার লস্করের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চালিয়েছে এই ভয়ঙ্কর হামলা।‘হামলোগ তো আপনে দেশমেই পরায়া বন গয়া। আপলোগ ক্যায়সে ভরোসা করোগে’! গত নভেম্বরের মুম্বাই হামলার ক্ষত দগদগে, ওদিকে প্রভাকরণ বনাম শ্রীলঙ্কা সেনার চলছে জীবন-মরণ যুদ্ধ। সবমিলিয়ে এমনই এক হামলার ছক বুঝতে গিয়ে মাথা ঘুরে যাওয়ার দশা। টেলিফোন রেখে দেওয়ার পরেও ওই কথাগুলো ক্রমাগত পাক খেয়ে গেলো মাথার ভিতর।‘আমরা তো নিজের দেশেই পরবাসী হয়ে গেলাম, আপনারা কীভাবে আমাদের ওপর ভরসা করতে পারেন’! কে ভরসা দেয়, কাকে দেয় অথবা কীই বা তার মর্মার্থ? বিশ্বায়িত এই দুনিয়ায় কোনকিছুই তো এখন আর নিজস্ব ইচ্ছা-অনিচ্ছার ধার ধারে না। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ অথবা কিছু বহুজাতিকের অথবা কিছু রাষ্ট্রনায়কের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অঙ্গুলিহেলনে প্রতিদিন এগিয়ে চলতে হয় একরাশ ভয় আর অজানা, অদেখা অন্ধকারকে সঙ্গী করে। কার যন্ত্রণা কে বহন করে বেড়াবে!
****************************************************
ভায়োলেন্স ইন স্পোর্টস। হ্যাঁ, এমনই এক বিষয় নিয়ে এখন চলছে জোর গবেষণা। না, এখন বলাটা বোধহয় ভুলই হবে। লাগামছাড়া পুঁজিবাদী দুনিয়ায় এমনই সব হিংস্রতার পালা দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। আজ আবার নতুন করে তার প্রকোপ সমাজবিজ্ঞানীদের বাধ্য করেছে সবকিছু। জটিল এক আবর্তে অন্ধের মতো ঘুরতে থাকা সামাজিক জীবনের অস্থিরতা ডানা মেলেছে খেলার দুনিয়াতে।নব আঙ্গিকে, নতুন কায়দায়।
ভায়োলেন্স। সোজাসাপটা এমনই এক ইংরাজি শব্দের যথার্থ আভিধানিক অর্থ খুঁজতে গেলে প্রচুর সমার্থক শব্দের আনাগোনা।যৎপরোনাস্তি প্রবলতা বা তীব্রতা, উগ্রতা, প্রচণ্ডতা, হিংস্রতা। তো এতো সমার্থক শব্দের ভিড়ে ওই হিংস্রতা শব্দটাই লাগসই। প্রবল এক আক্রোশে সবকিছু ভেঙে পড়ার পরিস্থিতি। শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ক্রিস গ্র্যাটনের ভাষায় বলতে গেলে,‘সেই ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের ভবিষ্যৎ বিচার করার কাজ এইমুহূর্তে খুব কঠিন এক কাজ এবং পরিস্থিতি ক্রমে যেখানে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে তারপর আশার আলো দেখাই যাচ্ছে না। যাবে বলেও মনে হয় না’।
১৯৭২ মিউনিখ ওলিম্পিকের নারকীয়তা অথবা ১৯৯৬ আটলান্টা ওলিম্পিকের আসরে আচমকা বোমা বিস্ফোরণ। এসবই জানা সচেতন পাঠককূলের। অথবা অনেক, অনেকখানি পিছিয়ে গিয়ে সেই ১৯৩৮ সালের বার্লিন ওলিম্পিকের আসর। জেসি ওয়েন্সের সোনা জয়, হিটলারের সামনে মাথা নত করে নাৎসী কায়দায় স্যালুট ইংল্যান্ড ফুটবল দলের। এটাও খুব পরিচিত পাঠকের কাছে। এবং মজার ব্যাপার, সেই খেলার জগতের হিংস্রতা বা উগ্রতার প্রকাশ এমনই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক অস্থিরতারই বহিঃপ্রকাশ। একুশ শতকে শুধু তার প্রতিফলনের ধারায় এসেছে পরিবর্তন, বদলে গেছে নারকীয়তার সংজ্ঞা। ফুটে উঠেছে হরেক বিপন্নতা। মাইকেল এটকিনসনের অতি জনপ্রিয় বই ‘ডেভিয়ান্স অ্যান্ড সোশ্যাল কন্ট্রোল ইন স্পোর্টস’য়ের মুখবন্ধে লেখা হচ্ছে,‘নিরঙ্কুশ খোলাবাজারে পুঁজিবাদের যবনিকার মুহূর্তে যে আঁধার নেমেছে তাকে দূর করতে ওই হত্যালীলাই পারে রাক্ষসগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে। ফলে যা হচ্ছে তাকে নেহাতই একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দিয়ে রাতে শান্তিতে ঘুমাতে যাওয়া কিন্তু চরম বোকামিই হয়ে দাঁড়াচ্ছে।মনে রাখবেন, ঘুমের ঘোরেও যে স্বপ্নের উদয় ঘটছে সেখানেই বেরিয়ে পড়ছে আমাদের মতো মানুষদের আসল বিপন্নতা’।চলুন একটু অন্যদিকে মুখ ঘোরানো যাক!
****************************************************
দয়া করে খেলার সঙ্গে রাজনীতিকে জড়িয়ে ফেলবেন না।
বহু পরিচিত এ এক সহজ, সরল ব্যাখ্যা। পাণ্ডিত্য অথবা অজ্ঞানতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার দরকার নেই এমন এক উক্তিকে। একেবারেই ছা-পোষা কথা বলে ধরা যেতে পারে। ঠিকই তো! রাজনীতির ছড়িয়ে অথবা জড়িয়ে পড়ার আরো অনেক উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ রয়েছে, কাজেই খেলার জগতে তাকে ধরেবেঁধে আনার প্রয়োজনটাই বা কী!কিন্তু একটু নির্জনে গিয়ে নতুনভাবে এমনই নির্বিষ মন্তব্যের অর্থ খুঁজতে বসলে সত্যিই কী আপনি এতোটা খোলামেলা মানসিকতা নিয়ে অতি সরলীকরণের পথে হাঁটতে পারবেন?
সম্ভবত না। হ্যাঁ, সচেতনভাবেই সম্ভবত শব্দ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এই দুনিয়ায় এমন মানুষের সংখ্যাও তো নেহাৎ কম নয় যাঁরা অনায়াসে মুহূর্তের ভিতর দিয়ে দিতে পারেন এমন এক দুর্বোধ্য বিশ্লেষণ যা দেখে এবং শুনে জুটে যায় বড়সড় জনসমর্থনও। অথচ তার বাইরে যে বিরাট পরিধি রয়েছে এবং সেখানে অহরহ যা ঘটেছে এবং ঘটে চলেছে, সেই সুদীর্ঘ ধারাবাহিক এক বিচিত্র প্রক্রিয়ারই প্রতিফলন ঘটেছে আজকের সেই হিংস্রতায়। গত শতকের শেষ কয়েকটি বছরে খেলার গুরুত্ব লাফ দিয়ে বেড়ে যাওয়াকে বিশ্বায়নের বড়সড় সাফল্য বলেই প্রচার করা হয়েছিলো। তেমনই এক জয়ের মাহাত্ম্যকে খুব বড় আকারে তুলে ধরা হলেও কেউ তো সেভাবে খতিয়ে দেখলেনই না!
হয়তো বা ধানের হাটে পানের বোল বলে মনে হতে পারে কিন্তু সেই গল্পটা কেমন যেন প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। প্রাচীন গ্রীসের একটি স্থান, নাম রোডস। সেই রোডসের অ্যাথলিট ছিলেন ডায়াগোরাস। যৌবন ডায়াগোরাস ওলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। তারপর একদিন ডায়াগোরাসের জীবদ্দশাতেই তাঁর দুই পুত্র পেলেন ওলিম্পিক পুরস্কার। সেই সময়ে ওলিম্পিক পুরস্কারের অর্থ ছিলো ওলিভ বা জলপাই পাতার মুকুট। সেই মুকুট তাঁরা বাবার মাথায় পরিয়ে দেন। দর্শকরাও ডায়াগোরাসকে ফুলের মালায় বরণ করে বলেছিলেন,‘এই জীবনে এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে না’! বিষয়টা হলো এই, এমন এক পবিত্র ভাবধারাকে আঁকড়ে ধরে যে চেতনা তৈরি হয়েছিলো সবার মনে এবং প্রত্যেকে তাকেই অনুসরণ করে রচনা করেছিলেন সুন্দর অধ্যায়, তা আর সেই গতি পেলো কৈ যা দিয়ে অনায়াসে থামিয়ে দেওয়া যেতে পারতো নারকীয়তায় ভরা আতঙ্কের ভয়াবহ ছবিগুলোকে।অ্যামেচারিজমকে রাতারাতি নস্যাৎ করে দিয়ে পেশাদারিত্বের মোড়কে যে বস্তু তুলে দেওয়া হলো হাতে তা আসলে বিকৃত কিছু ভাবধারার দুর্বোধ্য তত্ত্ব। দেশকে ভালোবাসা অথবা দেশাত্ববোধ নামক পরিশীলিত চিন্তার জগতকে ঢাল বানিয়ে পিছন থেকে চালু হয়ে গেলো ভোগবাদী ধ্যানধারণাকে ক্রমে উসকে দেওয়ার কাজ।
এটকিনসন সেই পুরো ব্যাপারকেই সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানাচ্ছেন, এই যে প্রতিহিংসাসূচক উগ্রতার জন্ম হয়েছে তাকে দিনের পর দিন লালন করেছে এমন কিছু তত্ত্ব যার সঙ্গে আমজনতার ছিলো না আদৌ কোন পরিচয় অথচ সেই সেই বিপুল সাধারণ জনতার মগজে সুক্ষভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে কখনও হিংসার ভাব, আবার কখনও সেই জায়গার দখল নিয়েছে আজগুবি সংস্কৃতি, অস্তিত্বরক্ষার অহেতুক তাগিদ বা বঞ্চনার মনগড়া কাহিনীকে। সেই বিচিত্র মিশেলে মানুষের মনে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছে প্রতিশোধের মানসিকতা। হিটলার তার বিবর্ণ অতীতকে ভুলতেই না নরখাদকের চেহারা ধারণ করেছিলো ইহুদি নিধনের মাধ্যমে এবং সেই পৈশাচিক কাণ্ডকারাখানাকে আরো মজবুত করতে ওলিম্পিকের মতো আসরকেও ছেড়ে কথা বলেনি। বলা যায়, সেই একপেশে ধারা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে গেছে খুব সহজেই।ঠিক যেমনটা মুসোলিনি অথবা ফ্রাঙ্কো অথবা লাতিন দুনিয়ার দেশগুলিতে বিশেষ করে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত স্বৈরাচারী শাসকদের ভয়ঙ্কর অত্যাচার এবং তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে চামড়ার গোলককেই সেরা মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একদিকে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের নব কলেবরে উন্মেষ,অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুবৃহৎ আস্ফালন। রাজনীতি, সমাজনীতির পাশাপাশি ক্রীড়াক্ষেত্রেও লাগলো তার ধাক্কা। একটু তলিয়ে দেখতে গেলে পুঁজিবাদের বিকাশই তো ঘটেছে এক অদ্ভুত স্ববিরোধী পদ্ধতিতে।ঊনবিংশ শতাব্দীতে পৃথক জাতিভিত্তিক যে রাষ্ট্রগুলি গড়ে উঠেছিলো, সেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে থেকেই উঠে আসে পুঁজিবাদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মার্কিন আস্ফালন খেলার মাঠে যে প্রভাব ফেলে তার রেশ হয়ে দাঁড়ায় সুদূরপ্রসারী। খেলাধূলাকে মূলধন বানিয়ে পুঁজি এবার জাতি এবং রাষ্ট্রের সীমানা অতিক্রম করার কাজ শুরু করে দেয়। বিনিয়োগ এবং ব্যবসা বাণিজ্যের অগ্রসরের মাধ্যমে সৃষ্টি বহুজাতিক সংস্থার। ঢালো টাকা, লুটে নাও মুনাফা, একেবারে জলের মতো সরল সেই নীতি চালুকরে দিয়ে যে বিষবৃক্ষ বপন করা হলো তাই ফুলে ফলে সমৃদ্ধ হয়ে এখন একে অপরের ঘোর শত্রুপক্ষে পরিণত।‘পুঁজি এবং সাধারণভাবে অর্থনৈতিক জীবনের আন্তর্জাতি ঐক্য’ গড়ে তোলার স্লোগানকে সামনে রেখে রাষ্ট্রীয় বেড়াজাল ভেঙে বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো বারুদ আর সুযোগ পেলেই প্রতিপক্ষকে যে কোন উপায়ে নিকেশ করে দেওয়ার মারণমন্ত্র!
****************************************************
যে জয়ী তাকে নিয়ে উন্মাদনা তো চিরকালীন এক সহজাত প্রবৃত্তি।কিন্তু পরাস্ত মানুষগুলোর কথা কে ভাববেন? যারা হারলেন তাঁরা কী তবে খেলাকে কোনদিনই ভালোবাসেননি অথবা পরাজয়ের গ্লানি তাঁদের সেই ভালোবাসার জায়গাকেই নষ্ট করে দিয়েছে?এটা ভাবা দুষ্কর হয়ে গেছে যে, এই খেলা মানবসভ্যতার শৈশব থেকেই রয়েছে। বিস্মৃত হতে হয় যে খেলা হলো মানব দেহমনের সঙ্গে বল, ব্যাট অথবা অন্যান্য ক্রীড়া উপকরণের স্বতঃস্ফূর্ত এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ আদান প্রদান।
মজার ব্যাপার, বর্তমান অরর্থনীতির ধারক এবং বাহক এবং নিয়ন্ত্রকদের খুব পছন্দের একটা কথা রয়েছে। তাকে বলা হয়ে থাকে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’। সোজা বাংলায় বলতে গেলে সবরকম বিধিনিষেধ তুলে নিতে হবে। জলাঞ্জলি দিতে হবে যাবতীয় নিয়ন্ত্রণ, সরকারী কোন বিষয়কে কোনভাবেই দেওয়া যাবে না খুব একটা স্বীকৃতি। পুঁজিপতিদের বেড়ে ওঠার জন্য চাই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। তো তেমন একটা ব্যবস্থা চালু করলে কী লাভ পাওয়া যেতে পারে? মাইক মার্কুইজি বলছেন,‘সেটাই তো একটা সমাজে জন্ম দেয় বিকৃত মানসিকতার যা সরকারী নিয়ন্ত্রণে থাকলে কখনই সম্ভব নয়’। আন্তর্জাতিক লগ্নী পুঁজির জোরাজুরিতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ধারণা সব দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। এবং সেই পুঁজির ঠেলায় মূল আদর্শ থেকে সরে এসে উদ্ভট জাতীয়তাবাদ অথবা পাশের লোককে রাতারাতি শত্রু বানিয়ে ফেলে নিকেশ করে ফেলার ব্যবস্থা করে ফেলা নিছল মামুলি বিষয়ে পরিণত। তবে যে কাণ্ড ঘটছে চিলিতে অথবা রাওয়ান্ডায় তার আকার কিন্তু এক নয় এশীয় দেশগুলিতে। ভৌগলিক ব্যবধানের কারণে সামাজিক, আর্থিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে যে পরিবর্তন রয়েছে তার সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই তৈরি হয়েছে হরেক পরিকল্পনা।
প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন বার্নেস বোধহয় সঠিক মন্তব্যই করেছিলেন। তাঁর উক্তি ছিলো,‘যেদিন থেকে খেলার মধ্যে জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর চল শুরু হলো, সেদিন থেকেই রাজনীতি, জাতীয়তাবোধ নামক শব্দগুলো আমজনতা এবং ক্রীড়াব্যক্তিত্বদের দিগভ্রান্ত করার কাজও শুরু করে দেয়’। নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা গতবছর এক প্রতিবেদনে লিখেছে, অর্থনিতিক উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করার ফলে বিশ্বায়নপন্থীদের পক্ষে দৃষ্টিভঙ্গির লক্ষ্য বদলে দেওয়ার কাজ অনেক সহজ হয়ে গেছে। ঠিক সেকারণেই কিউবার বক্সারদের সঙ্গে মুষ্ঠিযুদ্ধ অথবা বেসবল ম্যাচ থাকলেই স্বশরীরে হাজির থাকতেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশ। কিউবাকে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অবরোধের পাকেচক্রে বেঁধে ফেলেও কবজা করা যায়নি। সেই ব্যর্থতাকে ডাকা দিতে বুশ চিরকাল কাস্ত্রোর দেশের প্রতিযোগীদের ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা সদম্ভে প্রচার করে গেছেন, একই অবস্থানে দাঁড়িয়ে কাস্ত্রোও চালিয়েছেন প্রচার।
কোনটা ঠিক অথবা কোনটাই বা বেঠিক, তা ভেবে দেখার দরকার পড়ে বৈকি! বিশেষ করে যখন একটা গোটা দেশের সামগ্রিক আবেগকে কাজে লাগিয়ে তার মাধ্যমে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যসাধনের পরিকল্পনা প্রকট হয়ে পড়ে, তারপর চুপ করে বসে থাকার ভিতর খুব একটা বুদ্ধির পরিচয় রয়েছে বলে তো মনে হয় না। মিলিয়ে নিন তাহলে কয়েকটা তথ্য।
যুগোস্লাভিয়ার রেড স্টার বেলগ্রেদের নাম বিশ্বজোড়া।কিন্তু সেই জনপ্রিয়তার পিছনে রয়েছে আরো এক লুকানো তথ্য। সমাজতান্ত্রিক মারশাল টিটোর সময়কার ক্লাব তো রাতারাতি এখন খুল্লমখুল্লা সার্বিয়ার উগ্রবাদের জোরালো সমর্থকে ভর্তি এবং ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে ম্যাচ থাকলে তো কথাই নেই। সবকিছু ভুলে গিয়ে নারকীয়তায় মেতে উঠতে লাগে না একমুহূর্ত সময় নষ্ট করতে। অথবা ধরা যাক এইমুহূর্তে বিশ্বফুটবলে আলোড়ন ফেলে দেওয়া রিয়াল মাদ্রিদের কথা। ফ্রাঙ্কোর অত্যন্ত প্রিয় ক্লাব রিয়াল প্রথম থেকেই স্প্যানিশ সুপারম্যান তৈরি করার প্রক্রিয়ায় অতিমাত্রায় উৎসাহী এবং সেই উদ্দেশ্য সাধন রতে গিয়ে বলি হয়েছেন নিরপরাধ ক্যাটালান সম্প্রদায়ের মানুষজন। একই দেশের ভিতর দুই জাতিসত্তার অস্তিত্ব জাহির করার অসম লড়াই। বাধ্য হয়ে জন্ম বার্সেলোনার। ক্যাটালানদের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতিীক বার্সেলোনার পিছনে প্রত্যক্ষ মদত রয়েছে সন্ত্রাসবাদী চক্র ই টি এ(ইসকাদি টা আসকাটাসুনা)। ১৯৫৯ সালে জন্ম নেওয়া এই সন্ত্রাসবাদী চক্রের মূল লক্ষ্যই হলো পৃথক বস্ক কাউন্টি গড়ে তোলা। গ্লাসগো রেঞ্জার্স এবং গ্লাসগো সেল্টিক ক্লাবের ইতিহাস তো আরো ভয়ঙ্কর। একে অপরের ছায়া দেখলে রে রে করে তেড়ে যায় সমর্থকরা। উত্তর আয়ার্ল্যান্ডের গ্লাসগো রেঞ্জার্স কোনদিনই স্বীকার করেনা ব্রিটিশ সরকারকে এবং সেই ঘৃণাকে জাগিয়ে রাখতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এণ আই এক্সট্রিমিস্ট গ্রুপ, আর সেল্টিককে ভিছন থেকে সহায়তা দিয়ে চলেছে আই আর এ নামক আরেকটি সংস্থা। আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি নামক এই সন্ত্রাসবাদী সংস্থার জন্ম ব্রিটিশ ক্যাথলিকদের চরম বিরোধিতার মধ্যে দিয়ে এবং এখনও তাদের বাড়বাড়ন্ত রীতিমতো আতঙ্কের কারণে পরিণত আয়ার্ল্যান্ড সরকারের।
এগুলো হয়তো বা টুকরো কিছু উদাহরণ কিন্তু এভাবেই বিশ্ব ক্রীড়াজগতে বাসা বেঁধেছে উগ্রতা। বিশ্বাকপ জয় করলে ফায়দা তোলেন রিকার্ডো টেক্সেইরার মতো লোক। ব্রাজিল ফুটবল কনফডারেশনের সভাপতি টেক্সেইরার বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক অপরাধমূল অভিযোগ, তবু তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে। ওই একেকটা বিশ্বকাপ তাঁকে তুলে নিয়ে যায় উচ্চ শিখরে। সিলভিও বের্লুসকোনির কথাও ধরা যেতে পারে। দেশের সবথেকে ধনশালী ব্যক্তি বের্লুসকোনির মোট সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৮০ কোটি ডলার।খেলাধলা নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত পাগল ইতালি জনতার আবেগ ব্যবহার করে এ যুগের মুসোলিনির ভূমিকায় এ সি মিলানের সর্বোময় কর্তা যিনি জোরগলায় ঘোষণা করে দেন ‘ফোর্জা ইতালিয়া’। নতুন করে ফ্যাসিস্ত দর্শনকে চাঙ্গা এবং তরুণ প্রজন্মের ভিতর ঢুকিয়ে দিতে বের্লুসকোনির এমনই ভূমিকা নিয়ে বাকিরা একেবারে নীরব! অথবা সেই ফরাসী রাষ্ট্রপতি জাঁক শিরাক যিনি কীনা নির্বাচনী বৈতরণী পার হত বেছে নিলেন জিনেদিন জিদানের মতো মানুষকে। দেশের ঐক্য এবং সংহতির স্বার্থে আমজনতাকে একসূত্রে বাঁধার সেরা মাধ্যম জিদান, আর বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা নিও নাৎসি প্রার্থী জাঁ ল পেঁ ক্ষমতায় এলেই অভিবাসী এবং আলজেরিয়া জাত মানুষদের দেশছাড়া করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নামেন!
অথবা আমাদের দেশের কথাই যদি তোলা যায় তবে সেই বহুচর্চিত ভারত-পাক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন এক চরম দুঃস্বপ্ন। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, যে কোন প্রতিপক্ষের কাছে হার একশো শতাংশ ‘স্পোর্টিং’, কিন্তু পাকিস্তানের কাছে হারলেই সবকিছু রসাতলে যাওয়ার জোগাড়। রাতে ঘুম নেই, পাড়ার রকে খেলোয়াড়দের বাপান্ত করার তুখোড় প্রতিযোগিতা।ঠিক যেমন প্রতিবেশীকে হারতে পারলে যেন গোটা দুনিয়া জয়ের উল্লাস। পারলে মুসলিম মহল্লায় গিয়ে ছোটখাটো একটা হামলা বাধিয়ে দিলেও মন্দ হয় না! তখন ওই ‘স্পোর্টিং’ শব্দ রাতারাতি উধাও। অবচেতন মনে লুকিয়ে থাকা হিংস্রতা দাঁত-নখ বের করে তখন শুধু খুঁজে বেড়ায় প্রতিপক্ষকে বিক্ষত করতে। ঘরে ফিরে সেই এক ক্লান্তিকর অথচ নির্মম এক ভবিষ্যতের সঙ্কেত!
এমনই সব ঘটনা অথবা তথ্যসামগ্রী আমাদের কেমন যেন এক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রশ্নটা খেলাধূলার নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিষয়ক। যে চশমা চোখে লাগিয়ে আমরা সবকিছুকে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি সেটাও সঠিক কীনা, তা নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। সবকিছুতেই বাণিজ্যিক চাপ এবং স্বার্থের সঙ্ঘাত মাথাচাড়া দিতে দিতে এমন এক উচ্চতা ছুঁয়েছে তারপর তৈরি হয়েছে বিশ্বাসযোগ্যতার চরম সংকট। চোখের আড়ালে মাকড়শার মতো জাল বুনে চলেছে কোম্পানি-মিডিয়া চক্র। চাই দুর্দান্ত একটা পণ্য যাকে বাজরে ছেড়ে খুব সহজে বিক্রি করে দেওয়া যায়। মানবচরিত্রের অসরলরৈখিক, প্রতিসারী গুণগুলোকে ছেঁটে ফেলে সমস্তকিছুকে পরিণত করে ফেলা একটা ব্র্যান্ডে। সেই ব্র্যান্ড তৈরি করবে প্রবল উত্তেজনা, তৈরি করবে মারমুখী এক প্রতিযোগিতা, সাধারণ মানুষকে রাক্ষস বানিয়ে লেলিয়ে দেবে পাশের লোককে গিলে ফেলতে। কখনও সেই চেহারাটা সন্ত্রাসবাদীর, কখনও তার অবয়ব বহুজাতিকের লোলুপ হাতছানির। কী আছে সেই খেলার সার্থকতা যেখানে কীনা একটু রক্ত ঝরবে না, রাষ্ট্রনায়করা নিজস্ব আসন শক্ত রাখতে একটা গোটা জনশক্তিকে খেপিয়ে দিতে পারবে না! সম্পদের অসম বন্টন খেলার দুনিয়ার ভারসাম্যই একেবারে শেষ করে দিয়েছে।
বিশ্বায়নের মাঠে কেমন যেন আত্মঘাতীই হয়ে গেলো সবুজ ঘাসের সুষমা!
ইন্দ্রনীল দত্ত
‘Serious sports has nothing to do with fair play. It is bound up with hatred, jealousy, boastfulness, disregard of all rules, and sadistic pleasure in witnessing violence: in other words it is war minus the shooting!’ - George Orwell
৩রা মার্চ, ২০০৯। সাতসকালেই যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার যোগাড়। তামাম বিশ্বের টেলিভিশন চ্যানেলের লক্ষ্য লাহোর। তামাম বিশ্বের ক্যামেরার সুক্ষ চোখ তখন একনাগাড়ে ঘুরে চলেছে ফুলের শহরের পাথুরে রাস্তায়।
বিশাল আকারের এক বাস দাঁড়িয়ে। জানলার কাঁচে গুলির বড়সড় সব ফুটো। একপাশ দিয়ে ছুটে চলেছে নিরাপত্তারক্ষীর দল। হাতে তাদের খোলা কালাসনিকভ।ঠিক উল্টোপ্রান্তে ক্যামেরা ঘুরতেই যেন আতঙ্কের হিমেল স্রোত নেমে গেলো মেরুদণ্ড দিয়ে। মুখে জড়ানো কালো কাপড়। জনাতিনেক অজ্ঞাতপরিচয় মানুষ একতরফা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে দৌড়াচ্ছে। বারুদ আর আগুনের ধোঁয়ায় চারপাশে কেমন যেন মৃত্যুরই আনাগোনা।
গদ্দাফি স্টেডিয়ামে যাওয়ার পথে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলের ওপর আচমকা নেমে আসা ভয়ঙ্কর এক সন্ত্রাসবাদী হামলা। একেবারে লাইভ টেলিকাস্ট! কারা,কেন এই ক্রিকেটারদেরই বেছে নিলো নিকেষ করার মতলব এঁটে তা জানার তখনও কোনরকম উপায় নেই।
ক্যামেরা আবার ঘুরছে।কংক্রিটের মসৃণ রাস্তায় পড়ে কিছু লাস।রক্তাক্ত,বীভৎস, খণ্ড হয়ে যাওয়া কিছু মাংসপিণ্ড। কাদের লাশ? কাঁপতে কাঁপতে টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিনিধিদের গলা থেকে বেরিয়ে আসছে যতোটুকু কথাবার্তা তার মর্মার্থ উদ্ধার করে জানা গেছে, রয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু অকুতোভয় জওয়ান যাঁরা কীনা জীবনের পরোয়া না করেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বিশ্বের সেরা ক্রিকেট তারকাদের প্রাণ বাঁচাতে, অথচ নিজেরাই হারিয়ে গেলেন মুহূর্তে! আবার রয়েছে কিছু নিরপরাধ আমজনতারও শরীরের খণ্ডাংশ। ওঁরা বোধহয় ঠিক হামলার মুহূর্তে নিজেকে বাঁচাতে শেষ চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু পারেননি গুলির গতিবেগের সঙ্গে পাল্লা দিতে। উগ্র হিংস্রতার শিকারে সবকিছু তালগোল পাকিয়ে একাকার!
মোনা রানার সঙ্গে পরিচয় ১৯৯৯ সালে। দীর্ঘ অনিশ্চয়তার জাল কেটে পাকিস্তান ক্রিকেট দল খেলতে এসেছে ভারতে। প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচ গোয়ালিয়রে। তো স্টেশনে পা রেখে চক্ষু চড়কগাছ। থিকথিক করছে পুলিস আর বিশেষ নিরাপত্তারক্ষী।থমথমে চোখমুখ, যেন দাঙ্গা বেঁধেছে গোটা শহর জুড়ে।ফিসফাস শব্দ আর হরেক গুঞ্জন। ক্যাপ্টেন রূপ সিং স্টেডিয়ামের পরিবেশ দেখলে ভয় যেন আরো চেপেই বসে। বিশালাকৃতি সব কুকুর দিয়ে চলছে জোরদার তল্লাশি, এবং তারপরেও শেষ হচ্ছে না তল্লাশি। সমস্ত জিনিসপত্র খুলে, ছুঁড়ে দিতে কসুর করছে না পুলিস। এমনই এক আবহে মোনার সঙ্গে আলাপ।
বয়স মধ্য তিরিশ, বি বি সি’র লাহোর সংবাদদাতা মোনারও সেই প্রথমবার ভারতে পা রাখা। মহিলা বলে ছাড় নেই। হয়তো বা ওয়াঘার ওপার থেকে আসার কারণে তল্লাশির মাত্রা একটু বেশিই। চোখমুখ ছলছলে,‘একটা সময় তো গোটা দেশটাই ছিলো অবিভক্ত। আর আজ সেটা দুটো টুকরো হয়ে যেতেই এতো বৈপরীত্য!’ অনেকটা সেই হিন্দি ছবির আবেগঘন মন্তব্যের মতো কানে বেজেছিলো মন্তব্যটা। যাই হোক, সেই প্রসঙ্গে দ্বিতীয়বার না ঢুকে ধীরে ধীরে বেড়েছে পরিচয়। দরকারেই টেলিফোন করে খবর যোগাড় করতে দ্বিধাবোধ হয়নি।
৩রা মার্চের সন্ধ্যায় আবার টেলিফোন লাহোরে। প্রায় আধঘন্টা চেষ্টার পর লাইন যখন মিললো মোনার গলায় অদ্ভুত এক আতঙ্কের ছায়া,‘দোস্ত, হামলোগ বরবাদ হো গয়ে’! ততোক্ষণে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়ে গেছে সেই হামলার পিছনে থাকা চক্রের নাম নিয়ে বিবিধ পর্যালোচনা। লস্কর ই তৈবা গোষ্ঠীর সক্রিয় আক্রমণেই শ্রীলঙ্কা দলটাই প্রায় মরতে বসেছিলো। মোনাকেও প্রশ্ন করে যে ব্যাখ্যা মিলেছিলো তা বহু পরিচিত বীজগণিতের ফর্মূলার মতো। অতীতে হরকত উল আনসার গোষ্ঠীর সঙ্গে এল টি টি ই’র ভালো সম্পর্ক ছিলো। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে টাইগাররাই এবার লস্করের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চালিয়েছে এই ভয়ঙ্কর হামলা।‘হামলোগ তো আপনে দেশমেই পরায়া বন গয়া। আপলোগ ক্যায়সে ভরোসা করোগে’! গত নভেম্বরের মুম্বাই হামলার ক্ষত দগদগে, ওদিকে প্রভাকরণ বনাম শ্রীলঙ্কা সেনার চলছে জীবন-মরণ যুদ্ধ। সবমিলিয়ে এমনই এক হামলার ছক বুঝতে গিয়ে মাথা ঘুরে যাওয়ার দশা। টেলিফোন রেখে দেওয়ার পরেও ওই কথাগুলো ক্রমাগত পাক খেয়ে গেলো মাথার ভিতর।‘আমরা তো নিজের দেশেই পরবাসী হয়ে গেলাম, আপনারা কীভাবে আমাদের ওপর ভরসা করতে পারেন’! কে ভরসা দেয়, কাকে দেয় অথবা কীই বা তার মর্মার্থ? বিশ্বায়িত এই দুনিয়ায় কোনকিছুই তো এখন আর নিজস্ব ইচ্ছা-অনিচ্ছার ধার ধারে না। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ অথবা কিছু বহুজাতিকের অথবা কিছু রাষ্ট্রনায়কের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অঙ্গুলিহেলনে প্রতিদিন এগিয়ে চলতে হয় একরাশ ভয় আর অজানা, অদেখা অন্ধকারকে সঙ্গী করে। কার যন্ত্রণা কে বহন করে বেড়াবে!
****************************************************
ভায়োলেন্স ইন স্পোর্টস। হ্যাঁ, এমনই এক বিষয় নিয়ে এখন চলছে জোর গবেষণা। না, এখন বলাটা বোধহয় ভুলই হবে। লাগামছাড়া পুঁজিবাদী দুনিয়ায় এমনই সব হিংস্রতার পালা দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। আজ আবার নতুন করে তার প্রকোপ সমাজবিজ্ঞানীদের বাধ্য করেছে সবকিছু। জটিল এক আবর্তে অন্ধের মতো ঘুরতে থাকা সামাজিক জীবনের অস্থিরতা ডানা মেলেছে খেলার দুনিয়াতে।নব আঙ্গিকে, নতুন কায়দায়।
ভায়োলেন্স। সোজাসাপটা এমনই এক ইংরাজি শব্দের যথার্থ আভিধানিক অর্থ খুঁজতে গেলে প্রচুর সমার্থক শব্দের আনাগোনা।যৎপরোনাস্তি প্রবলতা বা তীব্রতা, উগ্রতা, প্রচণ্ডতা, হিংস্রতা। তো এতো সমার্থক শব্দের ভিড়ে ওই হিংস্রতা শব্দটাই লাগসই। প্রবল এক আক্রোশে সবকিছু ভেঙে পড়ার পরিস্থিতি। শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ক্রিস গ্র্যাটনের ভাষায় বলতে গেলে,‘সেই ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের ভবিষ্যৎ বিচার করার কাজ এইমুহূর্তে খুব কঠিন এক কাজ এবং পরিস্থিতি ক্রমে যেখানে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে তারপর আশার আলো দেখাই যাচ্ছে না। যাবে বলেও মনে হয় না’।
১৯৭২ মিউনিখ ওলিম্পিকের নারকীয়তা অথবা ১৯৯৬ আটলান্টা ওলিম্পিকের আসরে আচমকা বোমা বিস্ফোরণ। এসবই জানা সচেতন পাঠককূলের। অথবা অনেক, অনেকখানি পিছিয়ে গিয়ে সেই ১৯৩৮ সালের বার্লিন ওলিম্পিকের আসর। জেসি ওয়েন্সের সোনা জয়, হিটলারের সামনে মাথা নত করে নাৎসী কায়দায় স্যালুট ইংল্যান্ড ফুটবল দলের। এটাও খুব পরিচিত পাঠকের কাছে। এবং মজার ব্যাপার, সেই খেলার জগতের হিংস্রতা বা উগ্রতার প্রকাশ এমনই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক অস্থিরতারই বহিঃপ্রকাশ। একুশ শতকে শুধু তার প্রতিফলনের ধারায় এসেছে পরিবর্তন, বদলে গেছে নারকীয়তার সংজ্ঞা। ফুটে উঠেছে হরেক বিপন্নতা। মাইকেল এটকিনসনের অতি জনপ্রিয় বই ‘ডেভিয়ান্স অ্যান্ড সোশ্যাল কন্ট্রোল ইন স্পোর্টস’য়ের মুখবন্ধে লেখা হচ্ছে,‘নিরঙ্কুশ খোলাবাজারে পুঁজিবাদের যবনিকার মুহূর্তে যে আঁধার নেমেছে তাকে দূর করতে ওই হত্যালীলাই পারে রাক্ষসগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে। ফলে যা হচ্ছে তাকে নেহাতই একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দিয়ে রাতে শান্তিতে ঘুমাতে যাওয়া কিন্তু চরম বোকামিই হয়ে দাঁড়াচ্ছে।মনে রাখবেন, ঘুমের ঘোরেও যে স্বপ্নের উদয় ঘটছে সেখানেই বেরিয়ে পড়ছে আমাদের মতো মানুষদের আসল বিপন্নতা’।চলুন একটু অন্যদিকে মুখ ঘোরানো যাক!
****************************************************
দয়া করে খেলার সঙ্গে রাজনীতিকে জড়িয়ে ফেলবেন না।
বহু পরিচিত এ এক সহজ, সরল ব্যাখ্যা। পাণ্ডিত্য অথবা অজ্ঞানতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার দরকার নেই এমন এক উক্তিকে। একেবারেই ছা-পোষা কথা বলে ধরা যেতে পারে। ঠিকই তো! রাজনীতির ছড়িয়ে অথবা জড়িয়ে পড়ার আরো অনেক উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ রয়েছে, কাজেই খেলার জগতে তাকে ধরেবেঁধে আনার প্রয়োজনটাই বা কী!কিন্তু একটু নির্জনে গিয়ে নতুনভাবে এমনই নির্বিষ মন্তব্যের অর্থ খুঁজতে বসলে সত্যিই কী আপনি এতোটা খোলামেলা মানসিকতা নিয়ে অতি সরলীকরণের পথে হাঁটতে পারবেন?
সম্ভবত না। হ্যাঁ, সচেতনভাবেই সম্ভবত শব্দ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এই দুনিয়ায় এমন মানুষের সংখ্যাও তো নেহাৎ কম নয় যাঁরা অনায়াসে মুহূর্তের ভিতর দিয়ে দিতে পারেন এমন এক দুর্বোধ্য বিশ্লেষণ যা দেখে এবং শুনে জুটে যায় বড়সড় জনসমর্থনও। অথচ তার বাইরে যে বিরাট পরিধি রয়েছে এবং সেখানে অহরহ যা ঘটেছে এবং ঘটে চলেছে, সেই সুদীর্ঘ ধারাবাহিক এক বিচিত্র প্রক্রিয়ারই প্রতিফলন ঘটেছে আজকের সেই হিংস্রতায়। গত শতকের শেষ কয়েকটি বছরে খেলার গুরুত্ব লাফ দিয়ে বেড়ে যাওয়াকে বিশ্বায়নের বড়সড় সাফল্য বলেই প্রচার করা হয়েছিলো। তেমনই এক জয়ের মাহাত্ম্যকে খুব বড় আকারে তুলে ধরা হলেও কেউ তো সেভাবে খতিয়ে দেখলেনই না!
হয়তো বা ধানের হাটে পানের বোল বলে মনে হতে পারে কিন্তু সেই গল্পটা কেমন যেন প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। প্রাচীন গ্রীসের একটি স্থান, নাম রোডস। সেই রোডসের অ্যাথলিট ছিলেন ডায়াগোরাস। যৌবন ডায়াগোরাস ওলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। তারপর একদিন ডায়াগোরাসের জীবদ্দশাতেই তাঁর দুই পুত্র পেলেন ওলিম্পিক পুরস্কার। সেই সময়ে ওলিম্পিক পুরস্কারের অর্থ ছিলো ওলিভ বা জলপাই পাতার মুকুট। সেই মুকুট তাঁরা বাবার মাথায় পরিয়ে দেন। দর্শকরাও ডায়াগোরাসকে ফুলের মালায় বরণ করে বলেছিলেন,‘এই জীবনে এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে না’! বিষয়টা হলো এই, এমন এক পবিত্র ভাবধারাকে আঁকড়ে ধরে যে চেতনা তৈরি হয়েছিলো সবার মনে এবং প্রত্যেকে তাকেই অনুসরণ করে রচনা করেছিলেন সুন্দর অধ্যায়, তা আর সেই গতি পেলো কৈ যা দিয়ে অনায়াসে থামিয়ে দেওয়া যেতে পারতো নারকীয়তায় ভরা আতঙ্কের ভয়াবহ ছবিগুলোকে।অ্যামেচারিজমকে রাতারাতি নস্যাৎ করে দিয়ে পেশাদারিত্বের মোড়কে যে বস্তু তুলে দেওয়া হলো হাতে তা আসলে বিকৃত কিছু ভাবধারার দুর্বোধ্য তত্ত্ব। দেশকে ভালোবাসা অথবা দেশাত্ববোধ নামক পরিশীলিত চিন্তার জগতকে ঢাল বানিয়ে পিছন থেকে চালু হয়ে গেলো ভোগবাদী ধ্যানধারণাকে ক্রমে উসকে দেওয়ার কাজ।
এটকিনসন সেই পুরো ব্যাপারকেই সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানাচ্ছেন, এই যে প্রতিহিংসাসূচক উগ্রতার জন্ম হয়েছে তাকে দিনের পর দিন লালন করেছে এমন কিছু তত্ত্ব যার সঙ্গে আমজনতার ছিলো না আদৌ কোন পরিচয় অথচ সেই সেই বিপুল সাধারণ জনতার মগজে সুক্ষভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে কখনও হিংসার ভাব, আবার কখনও সেই জায়গার দখল নিয়েছে আজগুবি সংস্কৃতি, অস্তিত্বরক্ষার অহেতুক তাগিদ বা বঞ্চনার মনগড়া কাহিনীকে। সেই বিচিত্র মিশেলে মানুষের মনে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছে প্রতিশোধের মানসিকতা। হিটলার তার বিবর্ণ অতীতকে ভুলতেই না নরখাদকের চেহারা ধারণ করেছিলো ইহুদি নিধনের মাধ্যমে এবং সেই পৈশাচিক কাণ্ডকারাখানাকে আরো মজবুত করতে ওলিম্পিকের মতো আসরকেও ছেড়ে কথা বলেনি। বলা যায়, সেই একপেশে ধারা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে গেছে খুব সহজেই।ঠিক যেমনটা মুসোলিনি অথবা ফ্রাঙ্কো অথবা লাতিন দুনিয়ার দেশগুলিতে বিশেষ করে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত স্বৈরাচারী শাসকদের ভয়ঙ্কর অত্যাচার এবং তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে চামড়ার গোলককেই সেরা মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একদিকে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের নব কলেবরে উন্মেষ,অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুবৃহৎ আস্ফালন। রাজনীতি, সমাজনীতির পাশাপাশি ক্রীড়াক্ষেত্রেও লাগলো তার ধাক্কা। একটু তলিয়ে দেখতে গেলে পুঁজিবাদের বিকাশই তো ঘটেছে এক অদ্ভুত স্ববিরোধী পদ্ধতিতে।ঊনবিংশ শতাব্দীতে পৃথক জাতিভিত্তিক যে রাষ্ট্রগুলি গড়ে উঠেছিলো, সেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে থেকেই উঠে আসে পুঁজিবাদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মার্কিন আস্ফালন খেলার মাঠে যে প্রভাব ফেলে তার রেশ হয়ে দাঁড়ায় সুদূরপ্রসারী। খেলাধূলাকে মূলধন বানিয়ে পুঁজি এবার জাতি এবং রাষ্ট্রের সীমানা অতিক্রম করার কাজ শুরু করে দেয়। বিনিয়োগ এবং ব্যবসা বাণিজ্যের অগ্রসরের মাধ্যমে সৃষ্টি বহুজাতিক সংস্থার। ঢালো টাকা, লুটে নাও মুনাফা, একেবারে জলের মতো সরল সেই নীতি চালুকরে দিয়ে যে বিষবৃক্ষ বপন করা হলো তাই ফুলে ফলে সমৃদ্ধ হয়ে এখন একে অপরের ঘোর শত্রুপক্ষে পরিণত।‘পুঁজি এবং সাধারণভাবে অর্থনৈতিক জীবনের আন্তর্জাতি ঐক্য’ গড়ে তোলার স্লোগানকে সামনে রেখে রাষ্ট্রীয় বেড়াজাল ভেঙে বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো বারুদ আর সুযোগ পেলেই প্রতিপক্ষকে যে কোন উপায়ে নিকেশ করে দেওয়ার মারণমন্ত্র!
****************************************************
যে জয়ী তাকে নিয়ে উন্মাদনা তো চিরকালীন এক সহজাত প্রবৃত্তি।কিন্তু পরাস্ত মানুষগুলোর কথা কে ভাববেন? যারা হারলেন তাঁরা কী তবে খেলাকে কোনদিনই ভালোবাসেননি অথবা পরাজয়ের গ্লানি তাঁদের সেই ভালোবাসার জায়গাকেই নষ্ট করে দিয়েছে?এটা ভাবা দুষ্কর হয়ে গেছে যে, এই খেলা মানবসভ্যতার শৈশব থেকেই রয়েছে। বিস্মৃত হতে হয় যে খেলা হলো মানব দেহমনের সঙ্গে বল, ব্যাট অথবা অন্যান্য ক্রীড়া উপকরণের স্বতঃস্ফূর্ত এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ আদান প্রদান।
মজার ব্যাপার, বর্তমান অরর্থনীতির ধারক এবং বাহক এবং নিয়ন্ত্রকদের খুব পছন্দের একটা কথা রয়েছে। তাকে বলা হয়ে থাকে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’। সোজা বাংলায় বলতে গেলে সবরকম বিধিনিষেধ তুলে নিতে হবে। জলাঞ্জলি দিতে হবে যাবতীয় নিয়ন্ত্রণ, সরকারী কোন বিষয়কে কোনভাবেই দেওয়া যাবে না খুব একটা স্বীকৃতি। পুঁজিপতিদের বেড়ে ওঠার জন্য চাই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। তো তেমন একটা ব্যবস্থা চালু করলে কী লাভ পাওয়া যেতে পারে? মাইক মার্কুইজি বলছেন,‘সেটাই তো একটা সমাজে জন্ম দেয় বিকৃত মানসিকতার যা সরকারী নিয়ন্ত্রণে থাকলে কখনই সম্ভব নয়’। আন্তর্জাতিক লগ্নী পুঁজির জোরাজুরিতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ধারণা সব দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। এবং সেই পুঁজির ঠেলায় মূল আদর্শ থেকে সরে এসে উদ্ভট জাতীয়তাবাদ অথবা পাশের লোককে রাতারাতি শত্রু বানিয়ে ফেলে নিকেশ করে ফেলার ব্যবস্থা করে ফেলা নিছল মামুলি বিষয়ে পরিণত। তবে যে কাণ্ড ঘটছে চিলিতে অথবা রাওয়ান্ডায় তার আকার কিন্তু এক নয় এশীয় দেশগুলিতে। ভৌগলিক ব্যবধানের কারণে সামাজিক, আর্থিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে যে পরিবর্তন রয়েছে তার সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই তৈরি হয়েছে হরেক পরিকল্পনা।
প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন বার্নেস বোধহয় সঠিক মন্তব্যই করেছিলেন। তাঁর উক্তি ছিলো,‘যেদিন থেকে খেলার মধ্যে জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর চল শুরু হলো, সেদিন থেকেই রাজনীতি, জাতীয়তাবোধ নামক শব্দগুলো আমজনতা এবং ক্রীড়াব্যক্তিত্বদের দিগভ্রান্ত করার কাজও শুরু করে দেয়’। নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা গতবছর এক প্রতিবেদনে লিখেছে, অর্থনিতিক উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করার ফলে বিশ্বায়নপন্থীদের পক্ষে দৃষ্টিভঙ্গির লক্ষ্য বদলে দেওয়ার কাজ অনেক সহজ হয়ে গেছে। ঠিক সেকারণেই কিউবার বক্সারদের সঙ্গে মুষ্ঠিযুদ্ধ অথবা বেসবল ম্যাচ থাকলেই স্বশরীরে হাজির থাকতেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশ। কিউবাকে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অবরোধের পাকেচক্রে বেঁধে ফেলেও কবজা করা যায়নি। সেই ব্যর্থতাকে ডাকা দিতে বুশ চিরকাল কাস্ত্রোর দেশের প্রতিযোগীদের ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা সদম্ভে প্রচার করে গেছেন, একই অবস্থানে দাঁড়িয়ে কাস্ত্রোও চালিয়েছেন প্রচার।
কোনটা ঠিক অথবা কোনটাই বা বেঠিক, তা ভেবে দেখার দরকার পড়ে বৈকি! বিশেষ করে যখন একটা গোটা দেশের সামগ্রিক আবেগকে কাজে লাগিয়ে তার মাধ্যমে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যসাধনের পরিকল্পনা প্রকট হয়ে পড়ে, তারপর চুপ করে বসে থাকার ভিতর খুব একটা বুদ্ধির পরিচয় রয়েছে বলে তো মনে হয় না। মিলিয়ে নিন তাহলে কয়েকটা তথ্য।
যুগোস্লাভিয়ার রেড স্টার বেলগ্রেদের নাম বিশ্বজোড়া।কিন্তু সেই জনপ্রিয়তার পিছনে রয়েছে আরো এক লুকানো তথ্য। সমাজতান্ত্রিক মারশাল টিটোর সময়কার ক্লাব তো রাতারাতি এখন খুল্লমখুল্লা সার্বিয়ার উগ্রবাদের জোরালো সমর্থকে ভর্তি এবং ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে ম্যাচ থাকলে তো কথাই নেই। সবকিছু ভুলে গিয়ে নারকীয়তায় মেতে উঠতে লাগে না একমুহূর্ত সময় নষ্ট করতে। অথবা ধরা যাক এইমুহূর্তে বিশ্বফুটবলে আলোড়ন ফেলে দেওয়া রিয়াল মাদ্রিদের কথা। ফ্রাঙ্কোর অত্যন্ত প্রিয় ক্লাব রিয়াল প্রথম থেকেই স্প্যানিশ সুপারম্যান তৈরি করার প্রক্রিয়ায় অতিমাত্রায় উৎসাহী এবং সেই উদ্দেশ্য সাধন রতে গিয়ে বলি হয়েছেন নিরপরাধ ক্যাটালান সম্প্রদায়ের মানুষজন। একই দেশের ভিতর দুই জাতিসত্তার অস্তিত্ব জাহির করার অসম লড়াই। বাধ্য হয়ে জন্ম বার্সেলোনার। ক্যাটালানদের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতিীক বার্সেলোনার পিছনে প্রত্যক্ষ মদত রয়েছে সন্ত্রাসবাদী চক্র ই টি এ(ইসকাদি টা আসকাটাসুনা)। ১৯৫৯ সালে জন্ম নেওয়া এই সন্ত্রাসবাদী চক্রের মূল লক্ষ্যই হলো পৃথক বস্ক কাউন্টি গড়ে তোলা। গ্লাসগো রেঞ্জার্স এবং গ্লাসগো সেল্টিক ক্লাবের ইতিহাস তো আরো ভয়ঙ্কর। একে অপরের ছায়া দেখলে রে রে করে তেড়ে যায় সমর্থকরা। উত্তর আয়ার্ল্যান্ডের গ্লাসগো রেঞ্জার্স কোনদিনই স্বীকার করেনা ব্রিটিশ সরকারকে এবং সেই ঘৃণাকে জাগিয়ে রাখতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এণ আই এক্সট্রিমিস্ট গ্রুপ, আর সেল্টিককে ভিছন থেকে সহায়তা দিয়ে চলেছে আই আর এ নামক আরেকটি সংস্থা। আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি নামক এই সন্ত্রাসবাদী সংস্থার জন্ম ব্রিটিশ ক্যাথলিকদের চরম বিরোধিতার মধ্যে দিয়ে এবং এখনও তাদের বাড়বাড়ন্ত রীতিমতো আতঙ্কের কারণে পরিণত আয়ার্ল্যান্ড সরকারের।
এগুলো হয়তো বা টুকরো কিছু উদাহরণ কিন্তু এভাবেই বিশ্ব ক্রীড়াজগতে বাসা বেঁধেছে উগ্রতা। বিশ্বাকপ জয় করলে ফায়দা তোলেন রিকার্ডো টেক্সেইরার মতো লোক। ব্রাজিল ফুটবল কনফডারেশনের সভাপতি টেক্সেইরার বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক অপরাধমূল অভিযোগ, তবু তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে। ওই একেকটা বিশ্বকাপ তাঁকে তুলে নিয়ে যায় উচ্চ শিখরে। সিলভিও বের্লুসকোনির কথাও ধরা যেতে পারে। দেশের সবথেকে ধনশালী ব্যক্তি বের্লুসকোনির মোট সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৮০ কোটি ডলার।খেলাধলা নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত পাগল ইতালি জনতার আবেগ ব্যবহার করে এ যুগের মুসোলিনির ভূমিকায় এ সি মিলানের সর্বোময় কর্তা যিনি জোরগলায় ঘোষণা করে দেন ‘ফোর্জা ইতালিয়া’। নতুন করে ফ্যাসিস্ত দর্শনকে চাঙ্গা এবং তরুণ প্রজন্মের ভিতর ঢুকিয়ে দিতে বের্লুসকোনির এমনই ভূমিকা নিয়ে বাকিরা একেবারে নীরব! অথবা সেই ফরাসী রাষ্ট্রপতি জাঁক শিরাক যিনি কীনা নির্বাচনী বৈতরণী পার হত বেছে নিলেন জিনেদিন জিদানের মতো মানুষকে। দেশের ঐক্য এবং সংহতির স্বার্থে আমজনতাকে একসূত্রে বাঁধার সেরা মাধ্যম জিদান, আর বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা নিও নাৎসি প্রার্থী জাঁ ল পেঁ ক্ষমতায় এলেই অভিবাসী এবং আলজেরিয়া জাত মানুষদের দেশছাড়া করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নামেন!
অথবা আমাদের দেশের কথাই যদি তোলা যায় তবে সেই বহুচর্চিত ভারত-পাক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন এক চরম দুঃস্বপ্ন। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, যে কোন প্রতিপক্ষের কাছে হার একশো শতাংশ ‘স্পোর্টিং’, কিন্তু পাকিস্তানের কাছে হারলেই সবকিছু রসাতলে যাওয়ার জোগাড়। রাতে ঘুম নেই, পাড়ার রকে খেলোয়াড়দের বাপান্ত করার তুখোড় প্রতিযোগিতা।ঠিক যেমন প্রতিবেশীকে হারতে পারলে যেন গোটা দুনিয়া জয়ের উল্লাস। পারলে মুসলিম মহল্লায় গিয়ে ছোটখাটো একটা হামলা বাধিয়ে দিলেও মন্দ হয় না! তখন ওই ‘স্পোর্টিং’ শব্দ রাতারাতি উধাও। অবচেতন মনে লুকিয়ে থাকা হিংস্রতা দাঁত-নখ বের করে তখন শুধু খুঁজে বেড়ায় প্রতিপক্ষকে বিক্ষত করতে। ঘরে ফিরে সেই এক ক্লান্তিকর অথচ নির্মম এক ভবিষ্যতের সঙ্কেত!
এমনই সব ঘটনা অথবা তথ্যসামগ্রী আমাদের কেমন যেন এক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রশ্নটা খেলাধূলার নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিষয়ক। যে চশমা চোখে লাগিয়ে আমরা সবকিছুকে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি সেটাও সঠিক কীনা, তা নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। সবকিছুতেই বাণিজ্যিক চাপ এবং স্বার্থের সঙ্ঘাত মাথাচাড়া দিতে দিতে এমন এক উচ্চতা ছুঁয়েছে তারপর তৈরি হয়েছে বিশ্বাসযোগ্যতার চরম সংকট। চোখের আড়ালে মাকড়শার মতো জাল বুনে চলেছে কোম্পানি-মিডিয়া চক্র। চাই দুর্দান্ত একটা পণ্য যাকে বাজরে ছেড়ে খুব সহজে বিক্রি করে দেওয়া যায়। মানবচরিত্রের অসরলরৈখিক, প্রতিসারী গুণগুলোকে ছেঁটে ফেলে সমস্তকিছুকে পরিণত করে ফেলা একটা ব্র্যান্ডে। সেই ব্র্যান্ড তৈরি করবে প্রবল উত্তেজনা, তৈরি করবে মারমুখী এক প্রতিযোগিতা, সাধারণ মানুষকে রাক্ষস বানিয়ে লেলিয়ে দেবে পাশের লোককে গিলে ফেলতে। কখনও সেই চেহারাটা সন্ত্রাসবাদীর, কখনও তার অবয়ব বহুজাতিকের লোলুপ হাতছানির। কী আছে সেই খেলার সার্থকতা যেখানে কীনা একটু রক্ত ঝরবে না, রাষ্ট্রনায়করা নিজস্ব আসন শক্ত রাখতে একটা গোটা জনশক্তিকে খেপিয়ে দিতে পারবে না! সম্পদের অসম বন্টন খেলার দুনিয়ার ভারসাম্যই একেবারে শেষ করে দিয়েছে।
বিশ্বায়নের মাঠে কেমন যেন আত্মঘাতীই হয়ে গেলো সবুজ ঘাসের সুষমা!
what an idea sirji!
হোয়াট অ্যান আইডিয়া সারজী!
ইন্দ্রনীল দত্ত
Jocasta: What is its nature? What so hard on exiles?
Polyneices: One thing is worst, a man cannot speak out.
Jocasta: But this is slavery, not to speak one’s thought.
Plyneices: One must endure the unwisdom of one’s masters
-Euripides, The Phoenician Women.
সাল ১৯৯১। কান চলচ্চিত্র উৎসবে সবাইকে চমকে দিয়ে যখন ইথান এবং জোয়েল কোয়েন তুলে নিলেন পাম ডি’ওর সম্মান, তাক লেগে গেছিলো বিশেষজ্ঞমহলেরও। ছবির নাম ‘বার্টন ফিঙ্ক’। ১৯৪০’র দশকে হলিউডের এক মানুষের কাহিনী যিনি কীনা নাটক লিখে যেতেন নিজের মনে, তা সে অভিনীত হোক ছাই না হোক। নিজস্ব কল্পনা এবং ভাবনার জগতে থরে থরে সব ভাবনা এবং তা বেরিয়ে আসতো নাটকের আকারে। কথায় বলে, সবদিন সমান যায় না। এমন একেকটা দিনও আসে যখন সব ভাবনাগুলো পেয়ে যায় বিশেষ মাত্রা। তেমনই একটা দিনে বার্টনের বরাতও গেলো খুলে। প্রথম নাটক মঞ্চস্থ হতেই চারপাশে একেবারে হৈ হৈ কাণ্ড। এমন নাটকও তাহলে লেখা যায়! কতো খ্যাতি! কতো টাকা! কতো সম্মান! কোথা থেকে যেন জুটে গেলো ‘এজেন্ট’। বার্টন ভাসছেন হাওয়ায়। এবার?
‘এজেন্ট’ পরামর্শ দিলেন হলিউডে পাড়ি দিতে। একমাত্র হলিউডই দিতে পারে তাঁর যোগ্য মর্যাদা। প্রথম নাটক রাতারাতি আলোড়ন ফেলে দেওয়ার পর উচ্চাশাই তো স্বাভাবিক! এক টানে সোজা লস অ্যাঞ্জেলস। সেখানে এক স্টুডিও মালিকের বহুদিনের ইচ্ছা ছবি বানানোর এবং বার্টন হাজির হতেই তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হলো স্ক্রিপ্ট লেখার। কী হবে সেই স্ক্রিপ্টের উপজীব্য? না লিখতে হবে একেবারেই মোটা দাগের কুস্তি নিয়ে এক কাহিনী। তাও আবার হয় নাকি? এরজন্য এতোদূরে ছুটে আসা?অথচ প্রতিবাদ করার কোন উপায় নেই। চুক্তিতে লেখাই ছিলো,যে পরিমাণ টাকা চাইবেন তাই তুলে দেওয়া হবে, শর্ত শুধু একটাই যা বলা হবে তাই করতে হবে মুখ বুঁজে। মানসিক গ্লানিতে আক্রান্ত বার্টন হারিয়েই ফেললেন নিজেকে। হারিয়ে গেলো এক প্রতিভাধর নাট্যকারের জীবন!
ভাবছেন, এতো গৌরচন্দ্রিকা কেন? কী করা যাবে! ভারতবর্ষের মতো বুভুক্ষু দেশে কাঁড়ি কাঁড়ি সমস্যাকে সঙ্গে নিয়েও ক্রিকেট তো বহুদিন হলো ঢুকে পড়েছে শোয়ার ঘরে। ধোনি না যুবরাজ, কার গ্ল্যামার বেশি তা নিয়ে তর্কে বসে স্বামী-স্ত্রীর মুখ দেখাদেখিও বন্ধ হওয়ার জোগাড়। শুতে ক্রিকেট, জাগতে ক্রিকেট। অফিসে মালিকের রক্তচক্ষু, তাও একটু সুযোগ পেলেই জেনে নেওয়া সৌরভ কী পারলো ওই ‘হতভাগা’ নির্বাচকদের ‘মুখতোড়’ জবাব দিতে? এতো রমরমা বাজারে রীতিমতো ভূ কম্পন জাগিয়ে ইণ্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ( আই পি এল) যা দেখিয়ে দিয়ে গেলো তারপর তো আগেকার সমস্ত ভাবনা একেবারে ধুয়েমুছে সাফ। বাপ রে বাপ! এই না হলে ক্রিকেট!অনেকে তো আবার শুরুতেই এতো বাড়বাড়ন্ত দেখেশুনে বলতে লেগেছেন,‘ইনভেস্ট অ্যান্ড প্রফিট লিগ’! ব্রিটিশ তথা ইউরোপের ফুটবলমহল একনও কথায় কথায় তুলে আনেন ‘বেক-ম্যানিয়া’র প্রসঙ্গ। এবার বলিউডি তারকা এবং ব্যবসাদারদের যৌথ উদ্যোগে জন্ম নেওয়া আই পি এল সেই জোয়ারকেও সম্ভবত স্তিমিত করে দিলো! মাইক মার্কুইজির মতো অতি খুঁতখুঁতে ব্যক্তিত্ব যাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলছেন,‘এই আই পি এল হলো মোবাইল ফোন চালু করার সেই ক্যাশ কার্ড যার ওপর লাগানো রুপালি প্রলেপকে ঘসে নম্বর লাগানো যেতে পারে কিন্তু তাকে আর ঝেড়ে ফেলা যাবে না’। এবং এটাই আজকের ‘শাইনিং ইন্ডিয়ার’ সেরা মুখ! ইউসুফ পাঠানের বলে বলে ছয় মারার ঘটনা ঠিক কতোজন গড়গড় করে বলে দিতে পারবেন সেই বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। তার চাইতে যদি প্রশ্ন ছোঁড়া যায় প্রীতি জিন্টা ঠিক কতোবার বিভিন্ন‘পোজে’ তাঁর দলের কোন্ ক্রিকেটারকে কীভাবে আলিঙ্গন করেছেন অথবা শাহরুখ খানের প্রতি ম্যাচে পরণের পোশাক কতোবার বদলেছে, উত্তর দেওয়ার জন্য এতো হাত উঠবে তা গুনতে গুনতেই ক্লান্তি চলে আসতে বাধ্য।বিশ্বায়িত দুনিয়ার ভাবনা তো এমনই। সমস্তরকম সমস্যাকে দূরে সরিয়ে বিনোদনের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দেওয়ার মধ্যেই রয়েছে বেঁচে থাকার সার্থকতা, এবং সেই তথ্যকে সামনে এনেই আই পি এল অভিষেকেই সুপার হিট! এবং সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পর পড়ে থাকে একরাশ দাসত্বের ছবি যেখানে টাকা, স্রেফ টাকা দিয়েই তাবড় তারকার মুখে কুলুপ এঁটে দিয়ে খাটিয়ে নেওয়া গেলো নিজের মতো করে, যেমনটা হয়েছিলো বার্টনের!
...........................................................................................................
ফেব্রুয়ারি মাসে অ্যাডিলেডেতে খুব একটা বৃষ্টি হয় না কিন্তু তারপরেও প্রকৃতি যদি মনে করে জলবর্ষণ করবে, তাহলে কারই বা কিছু করণীয় থাকে! তেমনই এক বিকালে ভারতীয় ক্রিকেটের সেরা আইকন শচীন তেন্ডুলকার দৌড়াচ্ছিলেন নিজের মতো করে। ম্যাচ ফিটনেস ধররে রাখতে গেলে ওই দৌড় খুব জরুরী। কিন্তু ওনার পিছনে কে দৌড়াচ্ছেন? খবর নিয়ে দেখা গেছিলো ওই ব্যক্তি আসলে মুকেশ আম্বানি প্রেরিত দূত যাঁর কাজ ছিলো যে কোন মূল্যে শচীনকে রাজি করানো আই পি এল’য়ে খেলানো।
সেই ব্রিসবেন থেকে পিছু নেওয়া শুরু, ঘুরতে ঘুরতে মেলবোর্ন হয়ে ক্যানবেরা এবং সেখান থেকে অ্যাডিলেড। অবশেষে শচীনকে পাওয়া গেলো একান্তে। ওদিকে মুম্বাই থেকে প্রতিদিন নিয়ম করে টেলিফোনে ভেসে আসছে মুকেশ আম্বানির গলা,‘কাজ কতোটা এগলো?’ এতো জিজ্ঞাসা নয়, ঘুরিয়ে হুঁশিয়ারির ঢঙে জানতে চাওয়া আর কতোদিন অস্ট্রেলিয়ায় পড়ে থাকতে হবে? আই পি এল’র নিলামের সময় এগিয়ে আসছে অথচ কাদেরকে কেনা হবে তার তালিকাই এখনও হাতে এসে পৌঁছালো না! শেষমেশ মিললো সম্মতি, হাতে এলো তালিকা। অ্যাডিলেড থেকে শচীন রিলায়েন্সের দূত মারফত জানিয়ে দিলেন কাদের জন্য কতোটা বিনিয়োগ করা যেতে পারে।
কোন গল্পকথা নয়, এ হলো ভারতবর্ষের এক জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিক পত্রিকার। আই পি এল গোটা ক্রিকেটীয় প্রথাকে ভেঙেচুরে দিয়ে এমন এক বিকৃত আকার দিয়েছে যার ভরকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে ওই টাকার থলি। কার জন্য কতোটা ব্যয় করা যাবে মুদ্রা? মুনাফাসর্বস্বতায় বরাবরই ডুবে রয়েছে বাইশ গজের উইকেট, এবার তা কিছু ব্যবসাদার এবং কিছু জনপ্রিয় চিত্রতারকার সৌজন্যে এমন দৈত্যাকৃতি আকার নেবে তা চোখে না দেখলে অনুমান করার উপায় থাকতো না। আালাদা আলাদা আটটি দল যাদের মালিকও বিভিন্ন পরিমণ্ডল থেকে হাজির। অনেকটা সেই ইউরোপের ফুটবলের মতো অথবা আমেরিকার এন বি এন’র ধাঁচে তৈরি এক ভাবনার গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হলো ব্যাট-বলের স্ট্যাম্প। খোলামেলা, হুড়মুড় করে ঘাড়ের ওপর এসে পড়া প্রাচুর্যে ভরা এক নিখাদ ব্যবসার তত্ত্ব। আলাদা মালিক, ক্রিকেটারদের ঝুলিতে ভরে নিতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার থলি, বিজ্ঞাপনের টানা জোয়ার। টাকায় টাকা বাড়িয়ে নেওয়ার সেরা হাতিয়ার। আপনার যদি টাকা থাকে তাহলে তাকে পরিমাণে বাড়িয়ে নিতে পারেন অনায়াসে। বাজার দখল করার নতুন কায়দা। মুনাফা আর মুনাফার রাশি রাশি হিসাব। কোন ছুঁতমার্গ নেই!
বিশ্বায়িত দুনিয়ায় বাজারই বলে শেষ কথা। বাজারই শিখিয়ে দেয় কীভাবে, কোন পথে চলতে পারলে পাওয়া যেতে পারে মুনাফার উষ্ণতা। আই পি এল হলো সেই বাজারকে নিজের মতো করে শিখিয়ে পড়িয়ে নেওয়ার বিশাল বিচরণক্ষেত্র। ভারতীয় উপ মহাদেশে এই আই পি এল ধরেই নিয়ে আসা যায় নয়া বিপ্লব। এখানে সবার ঘুম ভাঙে আর চোখ বন্ধ হয় ওই ক্রিকেটের মালা জপতে, জপতে।এখানে চায়ের দোকানে লেগে যায় হাতাহাতি সৌরভ বনাম শচীনের রেষারেষির কাহিনী টানতে গিয়ে। মুহূর্তের ভিতর তৈরি হয়ে যায় নতুন সমর্থক, তৈরি হয়ে যায় নতুন উন্মাদনা। না হলে আর কীসের সাহসে ভর করে বিজয় মালিয়ার মতো আপাদমস্তক ব্যবসাদার রাতারাতি নিজের ইচ্ছায় ঘাড় ধরে বের করে দিতে পারেন প্রতিষ্ঠিত এক ধারাভাষ্যকারকে? সেই কবে যেন বলা হয়েছিলো,‘ক্রিকেট দ্য গ্লোরিয়াস আনসার্টেনটি’। না, এখন আর সেভাবে থাকার উপায় খোলা রইলো না। তার পরিবর্তে জায়গা করে নিলো,‘আমার দল, আমার টাকা, আমার জয়’। হার মানেই বিনিয়োগের চরম ক্ষতি, জিতলেই লাভের অঙ্ক গুনে নেওয়া দ্বিগুণ আকারে। মুনাফা ছাড়া বাকি সবিকছুর প্রবেশ প্রবলভাবে নিষিদ্ধ! এবং সবকিছুর ওপর শর্ত একটাই, মুখ বন্ধ করে দেখে যান কী হচ্ছে, কী হতে চলেছে। মুখ বন্ধ রাখার জন্যই না দেওয়া হচ্ছে এতো বিশাল অঙ্কের টাকা, তাও আবার বিদেশী মুদ্রায়। তারপর কথা কিসের?
...........................................................................................................
‘জানেন স্কিল এবং স্কোরবোর্ডকে বাদ দিলেও ক্রিকেটে রয়েছে এমনকিছু বিষয় যা এই খেলাটাকে আরো মোহময়ী করে তুলেছে। এক অদ্ভুত অবসর এবং শুদ্ধ বিনোদনের মেজাজ নিয়ে ক্রিকেট উপহার করে মানসিক প্রশান্তি। এক সুন্দর, হাল্কা তরঙ্গে ভেসে আসা সঙ্গীতের মতো যা ধীরে ধীরে সারাটা মন এবং শরীরকে ভরিয়ে দেয় অপার্থিব পরশে ঠিক যেমন আামার কাউন্টি ল্যাঙ্কাশায়ার খেলতো ক্রিকেট। অনেকেই হয়তো জানেন না তাই আজ চুপিচুপি সেই কথাটা বলে দেওয়া ভালো। এমনই এক মৃদুমন্থর ল্যাঙ্কাশায়ার দলের ব্যাটিং ইনিংসের ফাঁকে আমি সেরেছিলাম বিয়ে। কেন না জানতাম ওই কাজ সারার পরও মাঠে হাজির হলে দেখতে পাবো নিজের দলকে ব্যাট হাতে। ক্রিকেট সেই মসৃণতায় ভরা মাধুর্যে আজও সবার সেরা’।
এও কোন বানানো কথা নয়। বিশ্বক্রিকেট এখনও তাঁকে সম্মান জানাতে গিয়ে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করে না। সেই ব্যক্তিত্বের নাম নেভিল কার্ডাস। ধারাভাষ্যের পাশাপাশি ক্রিকেটীয় অসাধারণ সব নিবন্ধের গর্বিত লেখক এভাবএই ব্যক্ত করেছিলেন নিজস্ব আবেগকে। এখন অবশ্য তা নিয়ে ভাবতে গেলেও অবাক লাগে। মনে হয় কার্ডাস আদপে একজন আহাম্মকই ছিলেন! প্রতিমুহূর্তে চমক এবং প্রতিমুহূর্তে বিনিয়োগের দাঁড়িপাল্লায় যার তুল্যমূল্য বিচার করে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা হয় সেখানে ওই অলসতা মাখানো ক্রিকেটীয় রোমান্টিকতার স্থান কোথায়? নতুনদের নিয়ে বিপুল উৎসাহ, পুরানো হয়ে পড়া মানুষদের নিয়ে হরেক কাহিনী যাকে ‘ফোর্বস’ পত্রিকা ( জুলাই ২০০৮ সংখ্যা) বলছে,‘আবেগকে পুরোদস্তুর বিসর্জন দেওয়ার সময় আগত। এটা হলো গিয়ে বহজাতিকদের অবাধ মৃগয়াক্ষেত্র। যতো খুশি টাকা ঢালো, তুলে নাও কড়ায় গন্ডায় মুনাফার কড়ি। বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সমান্তরাল এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে এই বহুজাতিকরা তৈরি করে দিয়েছে এমন এক অর্থনীতি তার তল পাওয়া ভার অথচ তাই নির্ণয় করে দিচ্ছে ভবিষ্যৎ। এখন প্রতি সপ্তাহে কারুর দাম বাড়ে, কারুর আবার কমে।’ আর সেটাই এই প্রথমবার ভারতীয় ক্রিকেটের অন্দরে ধ্বনিত হলো সাড়ম্বরে। বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে একবার শুনে নিন ‘ওরা’ কী বলছেন!
শাহরুখ খান: ক্রিকেট নিয়ে যে বিরাট কিছু জানি তা আদৌ বলতে যাবো না।ওটা নিয়ে খুব একটা জ্ঞানও আমার নেই, খেলা ভালোবাসি এবং তারই টানে এই বিনিয়োগ। এও অস্বীকার করবো না ভারতীয় আর্থ-সামাজিক কাঠামোয় ক্রিকেট এমন এক শক্তপোক্ত জায়গা করে নিয়েছে যেখানে বিনিয়োগ করলে তার পুরোটাই উঠে আসসবে দ্বিগুণ আকারে।একটা বছর টাকা ঢালবো এবং তারপরেই সিদ্ধান্ত নেবো পরের বছর আমার কর্মপদ্ধতি কী দাঁড়াবে!
প্রীতি জিন্টা: ওটা আমার জানার আওতায় কোনদিনই ছিলো না। একবার আবদার করেছিলাম নেস ওয়াদিয়ার কাছে, এমনকিছু একটা উপহার দিতে যা কীনা বিশেষত্ব এবং মুনাফায় ভাসিয়ে দিয়ে যাবে সবকিছু। তো ওই বেছে দিলো এই ক্রিকেটকে। সত্যি বলতে, ক্রিকেট সম্পর্কে আমার জ্ঞানের বহর যদি জানতে চান তাহলে বলতেই হবে ওই চার এবং ছয় ছাড়া অন্যকিছুই আমার জানা নেই। মুনাফার দিকে নজর তো থাকবেই পাশাপাশি প্রচারের বাড়বাড়ন্তকে অস্বীকার করি কীভাবে! ওটাই আমাদের বেঁচে থাকার প্রধান হাতিয়ার এবং যারাই খেলবে আমার দলের হয়ে তাদেরকেও সাফ জানিয়ে দেবো, এই যে এতো টাকা লাগালাম তাকে আবার ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে ওদেরকেই। সেটা না হলে আর কিসের ক্রিকেট!
বিজয় মালিয়া: আমি চিরকালের ব্যবসাদার, বাজারের হালহকিকত বুঝে নিয়ে টাকা খাটিয়ে মুনাফা তোলাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। সুতরাং ক্রিকেটে যখন এভাবে টাকা খাটানোর সুযোগ এসেছে তখন হাত গুটিয়ে বসে থাকার প্রয়োজনই পড়ে না। মনে রাখবেন, টাকায় বাড়ে টাকা এবং সেই মন্ত্রে ভর করেই আমার এখানে আসা।
মুকেশ আম্বানি: মুম্বাই আমার প্রাণ এবং তারজন্য যদি বিনিয়োগ করে কিছু লাভ পাওয়া যায় তাহলে কেন নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখবো? টাকা লাগাবো, লোককে আনন্দ দেবো এবং তার হাত ধরে সুদে-আসলে তুলে নেবো লভ্যাংশের ভাগ। এখানে লজ্জার কী আছে!
তাহলে মোদ্দা ব্যাপার কী দাঁড়ালো? যারা কীনা রাতারাতি শচীন, সৌরভ, ধোনিদের নিলামের দাঁড়িপাল্লায় তুলে দিয়ে বেঁধে দিলো বাজারদর, তারা শুধুই বোঝে মুনাফা।কখনও ক্রিকেট, কখনও বা উষ্ণ পানীয়, আবার কখনও তার আকার রিয়াল এস্টেট! ভারতবর্ষের মতো দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার বাড়ে রক্তচাপ বাড়ার থেকেও দ্রুতগতিতে, অভাবের তাড়নায় খেটে খাওবা কৃষক বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। জাতপাতের ধুয়ো তুলে এক প্রদেশের মানুষজনকে ভিটেছাড়া করা হয় অবলীলায় আর তখনই বারো কোটি টাকার মূল্যের আকাশছোঁয়া ক্রিকেটের আয়োজন হয় কীভাবে? কোথা থেকে আআসে এতো পুঁজি? কিসের ভিত্তিতে ধোনির বাজারদর দাঁড়ায় ছ’কোটি? সবাই সব জানেন এবং তা জানেন বলেই মুখ ঘুরিয়ে বলেন অন্য কথা।
........................................................................................................
‘যদি ক্রিকেট খেলাটাকে ভালোবেসে থাকেন তাহলে দয়া করে তার সততা বজায় রাখার চেষ্টাও করবেন’। বাইশ গজের উইকেটের এ এক অতি পরিচিত এবং বহু প্রচলিত প্রবাদ। কথা হলো কে ভালোবাসেন? কাদেরই বা ‘সততা’ বজায় রাখার জন্য আহ্বান করা হচ্ছে? তাছাড়া আচমকা সততা বজায় রাখার প্রশ্নই বা উঠছে কেন? সত্যি বলতে, ওই প্রবাদ ধরে এগোতে থাকলে এভাবেই রাশি রাশি প্রশ্ন উঠে আসবে। আসতে বাধ্য এবং এও জেনে রাখবেন তার অধিকাংশেরই কোন জবাব নেই। বলা ভালো, কেউ তার জবাব দিতেই রাজি নন। এক অদ্ভুত উদাসীনতা ( পড়ুন অত্যন্ত সচেতনভাবে তাকে এড়িয়ে যাওয়া) নিয়ে প্রত্যেকে সবকিছু সোনেন তারপর নীরবে স্থানত্যাগ করে যান। কড়ি দেবো, বদলে মাখবো তেল, এটাই তো যুগ যুগ ধরে আকার নিয়েছে শাশ্বত সত্যের, ততবে কেন বাবা আজ ওই ‘সততা’ নামক শব্দকে হাজির করে বিড়ম্বনায় ফেলার প্রয়াস?
বহু আড়ম্বরে পালিত হয়ে গেলো ডন ব্র্যাডম্যানের জন্মশতবর্ষ কিন্তু সেটাই কী সব? ইন্টারনেট ঘাঁটতে ঘাঁটতে চোখে পড়লো এক বিচিত্র তথ্য। কুটামুন্দ্রার নীরব কুটিরে বসে জীবনের শেষ কটাদিন কাটানোর ফাঁকেই জীবনকে নিয়ে ভাবতে বসেছিলেন ডন। কী দিলেন! কীই বা পেলেন তার পরিবর্তে? বিশ্বক্রিকেটের অবিসংবাদী ব্যক্তিত্বকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো, ক্রিকেট কী দিলো আপনাকে? ডনের জবাব ছিলো এমন,‘আজ এই নীরবতায় বসে থাকতে থাকতে এটা ভেবে দারুণ লাগে এমন এক অধ্যায়ের সঙ্গে নিজের নাম যুক্ত রাখতে পারলাম যা কীনা সোনার চেয়েও অমূল্য। এক দুষ্প্রাপ্য স্মৃতি। এই ক্রিকেটেই ঘটলো ম্যাচ গড়াপেটার ঘটনা আবার এখানেই তো তৈরি হয়েছে এমনসব ইতিহাস যার কোনদিন কোন তুলনাই চলবে না। সেটাই কী কম পাওয়া হলো’! বেঁচে থাকলে আজ ডন কী পারতেন তেমনই এক যুক্তিতে অনড় থাকতে?
পাঠক বলবেন, কী দরকার রয়েছে এতো প্যাঁচ পয়জারের। এমনিতেই সমস্যায় জেরবার জীবন। চারপাশ জোড়া শুধু নেই আর নেই। সেখানে ওই একটু বিনোদনই তো পারে শান্তির প্রলেপ দিতে? নিশ্চয়ই, আপনি তা অনায়াসে বলতে পারেন। বলার পুরো হক রয়েছে আপনার কিন্তু বন্ধু তারই ফাঁকে একটু ভেবেও দেখবেন যা দেখলেন অথবা যা উপভোগ করলেন বলে গলা ফাটালেন তা কী নিছকই বিনোদন নাকি তার ভিতরে রয়েছে আরেক বাজারি ভয়ঙ্কর তত্ত্ব। ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় বহু অভিনবত্বের অন্যতম হলো দর্শকদের মনোরঞ্জন। যা খেলা হচ্ছে তা আদৌ বিনোদনমূলক কীনা তা জানার থেকে বাড়তি নজর দেওয়া হয়ে থাকে উপস্থিত দর্শক সংখ্যার ওপর। ওই ‘চিয়ারলিডার’দের কথাই ভাবা যাক। মাঠে খেলা হবে তারজন্য আলাদা করে স্বল্পবাস মহিলাদের উদ্দাম নৃত্যের কী প্রয়োজন পড়ে? কেউ বা স্বদেশীয়, কেউ আবার বিদেশ থেকে বহু টাকা খরচ করে তাদেরকে তুলে এনেছেন শুধুমাত্র দর্শকদের মন যোগাতে। ওরা নাচবেন, ওরা শরীরী ভাষায় হাজারো ভঙ্গিমা হাজির করে উত্তেজনার পারদকে বাড়িয়ে দেবেন দ্রুত হারে। সত্যি বলতে, আই পি এল যা দেখিয়ে দিয়ে গেলো তা সবদিক থেকেই নিপুণ এক পরিকল্পনার প্রকাশ। বুঁদ হয়ে যেতে হবে রাশি রাশি টাকার উড়ে যাওয়ার ছবি দেখতে দেখতে। তাই হয়েও গেলো ভারতীয় জনগণ। নিমেষে উড়ে গেলো আমজনতার পকেট থেকে মুঠো মুঠো পয়সা। মুখে রঙ, চোখে মাদকতার ছোঁয়া। আসলে ব্যবসার শর্তই তো ছিলো তাই। ক্রিকেটটা যেমনই হোক না কেন, সর্বদা এটা যেন মাথায় থাকে যারা বিনিয়োগ করছেন তারা যেন কখনোই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এবং পরিশেষে হিসাব কষে দেখা গেছে তাই-ই হয়েছে, বরঞ্চ যা ভাবা গেছিলো তার তুলনায় মুনাফার পরিমাণ তার তুলনায় অনেক বেশি। বাজারের চাহিদাই ছিলো এমনতরো। ইউরোপিয়ান ফুটবল পরিমণ্ডলের হাওয়া গায়ে লাগিয়ে ব্যক্তি মালিকানার অবাধ প্রবেশ এবং তার হাত ধরে উন্মুক্ত মুক্ত বাণিজ্যের পথ। বদলে গেলো ক্রিকেটের প্রথাগত ঘরানা, রুচি এবং রোজগার। সেখঅনে রোমান্টিকতা বলে আলাদাকিছুকে জায়গা ছেড়ে দেওয়ার অবকাশ রইলো না!
......................................................................................
আসুন দেখে ফেলা যাক কিছু অঙ্কের ধাঁধা।
৪৫ দিনে মোট ম্যাচ ৫৯। আট দলের লড়াই, প্রতিটি দল একে অপরের সঙ্গে খেলবে দু’বার করে। সেরা চার দল যাবে সেমিফাইনালে। মোট পুরস্কার মূল্য ১২ কোটি টাকা।
টাকার খেলা
মোট পুরস্কার মূল্য ১২ কোটি টাকা। বিজয়ী দল পাবে ৪.৮ কোটি টাকা, রানার্স পাবে ২.৪ কোটি টাকা।শেষ চারে উঠলেই ১.২ কোটি টাকা নিশ্চিত। পরবর্তী চারটি স্থানের দলের জন্য বরাদ্দ যথাক্রমে ৮০ লাখ, ৭০ লাখ, ৫০ লাখ এবং ৪০ লাখ টাকা। প্রতিযোগিতার সেরা পাবেন ১০ লাখ টাকা।
সেরা পাঁচ দামী ক্রিকেটার
মাহীন্দ্র সিং ধোনি, চেন্নাই, ৬ কোটি টাকা। অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস, হায়দরাবাদ, ৫.৪ কোটি টাকা। সনথ জয়সূর্য, মুম্বাই, ৩.৯ কোটি টাকা। ইশান্ত শর্মা, কলকাতা, ৩.৮ কোটি টাকা। ইরফান পাঠান, মোহালি, ৩.৭ কোটি টাকা।
আট দলের মালিকানা এবং অর্থমূল্য
চেন্নাই সুপার কিঙস, ইন্ডিয়া সিমেন্ট লিমিটেড, ৩৬৪ কোটি টাকা। বাঙ্গালোর রয়াল চ্যালেঞ্জার্স, বিজয় মালিয়া/ইউ বি গ্রুপ, ৪৪৬ কোটি টাকা। মুম্বাই ইন্ডিয়ানস, মুকেশ আম্বানি/রিলায়েন্স গ্রুপ, ৪৪৮ কোটি টাকা। কলকাতা নাইট রাইডার্স, শাহরুখ খান/ রেড চিলিজ ইন্ডাস্ট্রিজ, ৩০০ কোটি টাকা। কিঙস ইলেভেন পাঞ্জাব, নেস ওয়াদিয়া-প্রীতি জিন্টা-করণ পল-মোহিত বর্ধন, ৩০০ কোটি টাকা। হায়দরাবাদ ডেকান চার্জারস, ডেকান ক্রনিকল, ৪২৮ কোটি টাকা। দিল্লি ডেয়ারডেভিলস, জি এম আর স্পোর্টস, ৩৩৬ কোটি টাকা।রাজস্থান রয়ালস, এমার্জিং মিডিয়া, ২৬৮ কোটি টাকা।
আসর শেষে মুনাফা
কলকাতা নাইট রাইডার্স: নিট মুনাফার পরিমাণ ৮ কোটি টাকা।
রাজস্থান রয়ালস: নিট মুনাফার পরিমাণ ৫ কোটি টাকা।
কিঙস ইলেভেন পাঞ্জাব: নিট লোকসান ৩.৪ কোটি টাকা।
চেন্নাই সুপার কিঙস: নিট লোকসান ৪ কোটি টাকা।
দিল্লি ডেয়ারডেভিলস: নিট লোকসান ৮ কোটি টাকা।
ডেকান চার্জারস: নিট লোকসান ২০ কোটি টাকা।
মুম্বাই ইন্ডিয়ানস: নটি লোকসান ২১ কোটি টাকা।
বাঙ্গালোর রয়াল চ্যালেঞ্জার্স: নিট লোকসান ৪৫ কোটি টাকা।
ভাবা যায়, একশো দশ কোটি জনসংখ্যা ছাড়িয়ে যাওয়া একটা দেশে নিছক বিনোদনের চেহারা এমন বিশালাকায়!স্বাধীনতার পরে পরেই প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু নাকি বলেছিলেন কালোবাজারীদের ধরে ধরে ঝুলিয়ে দেবেন লাইটপোস্টে! দেখতে দেখতে স্বাধীনতার বয়স ষাট পেরিয়ে যাওয়ার পরেও কিছু হলো না।স্বাধীন দেশে লাইটপোস্টের সংখ্যা প্রচুর পরিমাণে বাড়লেও সেখানে জায়গা তো হলো না কোন কালোবাজারীর। দিন-রাত দেখার পরেও তো চিহ্নিত করা গেলো না কারা রাতারাতি গড়ে তুলেছেন সমান্তরাল সাম্রাজ্য! খোলা বাজারে সবাই চলনসই, সবই চলে চাহিদার খিদে মেটাতে।ক্রিকেটকে ঘাটে তুলে দিয়ে তারই চিতার ওপর বিপুল আয়োজন বিপাশা, ঋত্বিক অথবা নয়নতারাদের মতো সুন্দর কিছু মুখের সারি। রাগী যুবক অক্ষয় কুমার হাতে ব্যাট নিয়ে অত্যাধুনিক আলো-আঁধারিতে এমন কসরত শুরু করলেন, দেখলে মনে হবে যেন পার্থের গনগনে উইকেটে বেদম প্রহার করছেন ম্যাকগ্রথ, লি’দের! প্রশন ছুঁড়ে দিলে জবাবও তৈরি,‘আমি তো সেই কবে থেকে ক্রিকেটর ভক্ত। তাছাড়া দিল্লির দল খেলবে আর আমি কীনা তাদের পাশে এসে দাঁড়াবো না!’ কী অপার প্রেম!
আবার সর্বাঙ্গ দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে ঋত্বিক রোশন বলে উঠলেন,‘দুনিয়া হিলা দেঙ্গে’।পাশে ছোট্ট এক ছেলে। এ কোন ছেলে? সেই ছেলেটা না যে কীনা বন্ধুর নতুন গাড়িতে করে বাড়ি ফেরে বেজার মুখে। ছোট্ট মুখের একরাশ হতাশাকে দেখে বাবা পরদিনই ছোটেন ‘শো-রুমে’ নতুন গাড়ি কিনতে এবং কোথায় যেন নিমেষে তৈরি হয়ে যায় এক দুর্বোধ্য চাহিদা! সেই ছেলেটা না যার রাগ ভাঙাতে মা’কে ছুটতে হয় ঝাঁ-চকচকে খেলনার দোকানে যেখানে থরে থরে সাজানো টেলিভিসনের সারি। দোকানের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা ঠাণ্ডা হাওয়া নিমেষে দূর করে দেয় যাবতীয় গ্লানি। নাকি ওই ছোট্ট মুখে লুকিয়ে একমুঠো ভাত না পাওয়ার অব্যক্ত বেদনা,‘আশ্চর্য ভাতের গন্ধ রাতের আকাশে,/কারা যেন আজো ভাত রাঁধে, ভাত বাড়ে, ভাত খায়।/আর আমরা জেগে থাকি আশ্চর্য ভাতের গন্ধে/ প্রার্থনায় সারা রাত’। কোন ছেলেকে দেখবো? আমরা আসলে কার মুখ খুঁজি বলুন তো!
সত্যি বলতে, আই পি এল তো ব্যবসা করে নিলো দুটো মূলসূত্রের ওপর দাঁড়িয়ে। একদিকে থাকবে বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞাপনের প্রয়োগ ঘটিয়ে মুনাফার জায়গা করে রাখা, অন্যদিকে টিকিট বিক্রি করে বাকি লভ্যাংশ ঘরে তুলে নিয়ে যাওয়া। বহুদন আগে এই তত্ত্বই তো আমাদের দেখিয়েছিলেন পল সুইজি এবং ব্যারন। একচেটিয়া পুঁজিবাদ নিজেই তৈরি করে নেয় সামাজিক এক চাহিদা এবং নিজেই তা পূরণ করার ব্যবস্থাও করে দেয়।আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে সবকিছুই তো ভালো চলছে অথচ ঘটনা আদৌ তা নয়।ভাবনাকে রাতারাতি অন্য এক জায়গায় প্রতিস্থাপন করে দেওয়ার খেলা চলতে থাকে সেই একচেটিয়া পুঁজিবাদের হাত ধরে। তৈরি হয়েছে জনসমর্থনের আলাদা আলাদা ক্ষেত্র, বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ গলা ফাটাচ্ছেন তাদের দলের হয়ে। কাদের দল? আমজনতা নাকি শাহরুখ-প্রীতির টাকায় কেনা বিজ্ঞাপনী প্রচারের? মিশে যাচ্ছে সংকীর্ণ এক আবেগ এবং তারই নির্যাসে জারিত হয়ে তৈরি হচ্ছে বিচিত্র এক আনুগত্যবোধ! বরঞ্চ আই পি এল এমনই এক খোলামেলা বিষয় যেখানে বিনিয়োগ এবং মুনাফার মধ্যে নেই কোন ছুঁতমার্গ। ভারতবর্ষের মতো দেশে নড়বড়ে আর্থ সামাজিক কাঠামোর ভিতর দাঁড়িয়ে থাকা বিভিন্ন স্তর থেকে উঠে আসা মানুষের মধ্যে ক্রিকেটর বাজারি চেহারাকে আরো একটু গভীরভাবে প্রোথিত করে দেওয়ার সেরা উপায় এই আই পি এল।
আর এটাই হলো বিশ্বক্রীড়ার কল্পজগতের সঙ্গে বাস্তবতার যথার্থ মিশ্রণ যেখানে বাজারের চাহিদাই এই নতুন তত্ত্বকে পরিণত করে দিলো দুরন্ত এক পরীক্ষার উপাদানে। ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কিছু মানুষের ইচ্ছা যে কী ভয়ঙ্কর আকার নিয়ে সবাইকে গিলে নিতে পারে, তা কী এই খেলা চালু না হলে অনুভব করা যেতো?বিবেক, বুদ্ধিকে বিসর্জন দিয়ে রঙিন আলোর নিচে অর্ধনগ্ন নারীদেহের বিভঙ্গরেখার স্বাদ নেওয়ারও তো আলাদা এক তৃপ্তি রয়েছে। প্রতি বলেই তো এখন মুনাফা। আপনার ইচ্ছা হোক বা নাই হোক শামিল হতে হবেই।
‘হোয়াট অ্যান আইডিয়া সারজী!’
ইন্দ্রনীল দত্ত
Jocasta: What is its nature? What so hard on exiles?
Polyneices: One thing is worst, a man cannot speak out.
Jocasta: But this is slavery, not to speak one’s thought.
Plyneices: One must endure the unwisdom of one’s masters
-Euripides, The Phoenician Women.
সাল ১৯৯১। কান চলচ্চিত্র উৎসবে সবাইকে চমকে দিয়ে যখন ইথান এবং জোয়েল কোয়েন তুলে নিলেন পাম ডি’ওর সম্মান, তাক লেগে গেছিলো বিশেষজ্ঞমহলেরও। ছবির নাম ‘বার্টন ফিঙ্ক’। ১৯৪০’র দশকে হলিউডের এক মানুষের কাহিনী যিনি কীনা নাটক লিখে যেতেন নিজের মনে, তা সে অভিনীত হোক ছাই না হোক। নিজস্ব কল্পনা এবং ভাবনার জগতে থরে থরে সব ভাবনা এবং তা বেরিয়ে আসতো নাটকের আকারে। কথায় বলে, সবদিন সমান যায় না। এমন একেকটা দিনও আসে যখন সব ভাবনাগুলো পেয়ে যায় বিশেষ মাত্রা। তেমনই একটা দিনে বার্টনের বরাতও গেলো খুলে। প্রথম নাটক মঞ্চস্থ হতেই চারপাশে একেবারে হৈ হৈ কাণ্ড। এমন নাটকও তাহলে লেখা যায়! কতো খ্যাতি! কতো টাকা! কতো সম্মান! কোথা থেকে যেন জুটে গেলো ‘এজেন্ট’। বার্টন ভাসছেন হাওয়ায়। এবার?
‘এজেন্ট’ পরামর্শ দিলেন হলিউডে পাড়ি দিতে। একমাত্র হলিউডই দিতে পারে তাঁর যোগ্য মর্যাদা। প্রথম নাটক রাতারাতি আলোড়ন ফেলে দেওয়ার পর উচ্চাশাই তো স্বাভাবিক! এক টানে সোজা লস অ্যাঞ্জেলস। সেখানে এক স্টুডিও মালিকের বহুদিনের ইচ্ছা ছবি বানানোর এবং বার্টন হাজির হতেই তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হলো স্ক্রিপ্ট লেখার। কী হবে সেই স্ক্রিপ্টের উপজীব্য? না লিখতে হবে একেবারেই মোটা দাগের কুস্তি নিয়ে এক কাহিনী। তাও আবার হয় নাকি? এরজন্য এতোদূরে ছুটে আসা?অথচ প্রতিবাদ করার কোন উপায় নেই। চুক্তিতে লেখাই ছিলো,যে পরিমাণ টাকা চাইবেন তাই তুলে দেওয়া হবে, শর্ত শুধু একটাই যা বলা হবে তাই করতে হবে মুখ বুঁজে। মানসিক গ্লানিতে আক্রান্ত বার্টন হারিয়েই ফেললেন নিজেকে। হারিয়ে গেলো এক প্রতিভাধর নাট্যকারের জীবন!
ভাবছেন, এতো গৌরচন্দ্রিকা কেন? কী করা যাবে! ভারতবর্ষের মতো বুভুক্ষু দেশে কাঁড়ি কাঁড়ি সমস্যাকে সঙ্গে নিয়েও ক্রিকেট তো বহুদিন হলো ঢুকে পড়েছে শোয়ার ঘরে। ধোনি না যুবরাজ, কার গ্ল্যামার বেশি তা নিয়ে তর্কে বসে স্বামী-স্ত্রীর মুখ দেখাদেখিও বন্ধ হওয়ার জোগাড়। শুতে ক্রিকেট, জাগতে ক্রিকেট। অফিসে মালিকের রক্তচক্ষু, তাও একটু সুযোগ পেলেই জেনে নেওয়া সৌরভ কী পারলো ওই ‘হতভাগা’ নির্বাচকদের ‘মুখতোড়’ জবাব দিতে? এতো রমরমা বাজারে রীতিমতো ভূ কম্পন জাগিয়ে ইণ্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ( আই পি এল) যা দেখিয়ে দিয়ে গেলো তারপর তো আগেকার সমস্ত ভাবনা একেবারে ধুয়েমুছে সাফ। বাপ রে বাপ! এই না হলে ক্রিকেট!অনেকে তো আবার শুরুতেই এতো বাড়বাড়ন্ত দেখেশুনে বলতে লেগেছেন,‘ইনভেস্ট অ্যান্ড প্রফিট লিগ’! ব্রিটিশ তথা ইউরোপের ফুটবলমহল একনও কথায় কথায় তুলে আনেন ‘বেক-ম্যানিয়া’র প্রসঙ্গ। এবার বলিউডি তারকা এবং ব্যবসাদারদের যৌথ উদ্যোগে জন্ম নেওয়া আই পি এল সেই জোয়ারকেও সম্ভবত স্তিমিত করে দিলো! মাইক মার্কুইজির মতো অতি খুঁতখুঁতে ব্যক্তিত্ব যাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলছেন,‘এই আই পি এল হলো মোবাইল ফোন চালু করার সেই ক্যাশ কার্ড যার ওপর লাগানো রুপালি প্রলেপকে ঘসে নম্বর লাগানো যেতে পারে কিন্তু তাকে আর ঝেড়ে ফেলা যাবে না’। এবং এটাই আজকের ‘শাইনিং ইন্ডিয়ার’ সেরা মুখ! ইউসুফ পাঠানের বলে বলে ছয় মারার ঘটনা ঠিক কতোজন গড়গড় করে বলে দিতে পারবেন সেই বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। তার চাইতে যদি প্রশ্ন ছোঁড়া যায় প্রীতি জিন্টা ঠিক কতোবার বিভিন্ন‘পোজে’ তাঁর দলের কোন্ ক্রিকেটারকে কীভাবে আলিঙ্গন করেছেন অথবা শাহরুখ খানের প্রতি ম্যাচে পরণের পোশাক কতোবার বদলেছে, উত্তর দেওয়ার জন্য এতো হাত উঠবে তা গুনতে গুনতেই ক্লান্তি চলে আসতে বাধ্য।বিশ্বায়িত দুনিয়ার ভাবনা তো এমনই। সমস্তরকম সমস্যাকে দূরে সরিয়ে বিনোদনের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দেওয়ার মধ্যেই রয়েছে বেঁচে থাকার সার্থকতা, এবং সেই তথ্যকে সামনে এনেই আই পি এল অভিষেকেই সুপার হিট! এবং সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পর পড়ে থাকে একরাশ দাসত্বের ছবি যেখানে টাকা, স্রেফ টাকা দিয়েই তাবড় তারকার মুখে কুলুপ এঁটে দিয়ে খাটিয়ে নেওয়া গেলো নিজের মতো করে, যেমনটা হয়েছিলো বার্টনের!
...........................................................................................................
ফেব্রুয়ারি মাসে অ্যাডিলেডেতে খুব একটা বৃষ্টি হয় না কিন্তু তারপরেও প্রকৃতি যদি মনে করে জলবর্ষণ করবে, তাহলে কারই বা কিছু করণীয় থাকে! তেমনই এক বিকালে ভারতীয় ক্রিকেটের সেরা আইকন শচীন তেন্ডুলকার দৌড়াচ্ছিলেন নিজের মতো করে। ম্যাচ ফিটনেস ধররে রাখতে গেলে ওই দৌড় খুব জরুরী। কিন্তু ওনার পিছনে কে দৌড়াচ্ছেন? খবর নিয়ে দেখা গেছিলো ওই ব্যক্তি আসলে মুকেশ আম্বানি প্রেরিত দূত যাঁর কাজ ছিলো যে কোন মূল্যে শচীনকে রাজি করানো আই পি এল’য়ে খেলানো।
সেই ব্রিসবেন থেকে পিছু নেওয়া শুরু, ঘুরতে ঘুরতে মেলবোর্ন হয়ে ক্যানবেরা এবং সেখান থেকে অ্যাডিলেড। অবশেষে শচীনকে পাওয়া গেলো একান্তে। ওদিকে মুম্বাই থেকে প্রতিদিন নিয়ম করে টেলিফোনে ভেসে আসছে মুকেশ আম্বানির গলা,‘কাজ কতোটা এগলো?’ এতো জিজ্ঞাসা নয়, ঘুরিয়ে হুঁশিয়ারির ঢঙে জানতে চাওয়া আর কতোদিন অস্ট্রেলিয়ায় পড়ে থাকতে হবে? আই পি এল’র নিলামের সময় এগিয়ে আসছে অথচ কাদেরকে কেনা হবে তার তালিকাই এখনও হাতে এসে পৌঁছালো না! শেষমেশ মিললো সম্মতি, হাতে এলো তালিকা। অ্যাডিলেড থেকে শচীন রিলায়েন্সের দূত মারফত জানিয়ে দিলেন কাদের জন্য কতোটা বিনিয়োগ করা যেতে পারে।
কোন গল্পকথা নয়, এ হলো ভারতবর্ষের এক জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিক পত্রিকার। আই পি এল গোটা ক্রিকেটীয় প্রথাকে ভেঙেচুরে দিয়ে এমন এক বিকৃত আকার দিয়েছে যার ভরকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে ওই টাকার থলি। কার জন্য কতোটা ব্যয় করা যাবে মুদ্রা? মুনাফাসর্বস্বতায় বরাবরই ডুবে রয়েছে বাইশ গজের উইকেট, এবার তা কিছু ব্যবসাদার এবং কিছু জনপ্রিয় চিত্রতারকার সৌজন্যে এমন দৈত্যাকৃতি আকার নেবে তা চোখে না দেখলে অনুমান করার উপায় থাকতো না। আালাদা আলাদা আটটি দল যাদের মালিকও বিভিন্ন পরিমণ্ডল থেকে হাজির। অনেকটা সেই ইউরোপের ফুটবলের মতো অথবা আমেরিকার এন বি এন’র ধাঁচে তৈরি এক ভাবনার গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হলো ব্যাট-বলের স্ট্যাম্প। খোলামেলা, হুড়মুড় করে ঘাড়ের ওপর এসে পড়া প্রাচুর্যে ভরা এক নিখাদ ব্যবসার তত্ত্ব। আলাদা মালিক, ক্রিকেটারদের ঝুলিতে ভরে নিতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার থলি, বিজ্ঞাপনের টানা জোয়ার। টাকায় টাকা বাড়িয়ে নেওয়ার সেরা হাতিয়ার। আপনার যদি টাকা থাকে তাহলে তাকে পরিমাণে বাড়িয়ে নিতে পারেন অনায়াসে। বাজার দখল করার নতুন কায়দা। মুনাফা আর মুনাফার রাশি রাশি হিসাব। কোন ছুঁতমার্গ নেই!
বিশ্বায়িত দুনিয়ায় বাজারই বলে শেষ কথা। বাজারই শিখিয়ে দেয় কীভাবে, কোন পথে চলতে পারলে পাওয়া যেতে পারে মুনাফার উষ্ণতা। আই পি এল হলো সেই বাজারকে নিজের মতো করে শিখিয়ে পড়িয়ে নেওয়ার বিশাল বিচরণক্ষেত্র। ভারতীয় উপ মহাদেশে এই আই পি এল ধরেই নিয়ে আসা যায় নয়া বিপ্লব। এখানে সবার ঘুম ভাঙে আর চোখ বন্ধ হয় ওই ক্রিকেটের মালা জপতে, জপতে।এখানে চায়ের দোকানে লেগে যায় হাতাহাতি সৌরভ বনাম শচীনের রেষারেষির কাহিনী টানতে গিয়ে। মুহূর্তের ভিতর তৈরি হয়ে যায় নতুন সমর্থক, তৈরি হয়ে যায় নতুন উন্মাদনা। না হলে আর কীসের সাহসে ভর করে বিজয় মালিয়ার মতো আপাদমস্তক ব্যবসাদার রাতারাতি নিজের ইচ্ছায় ঘাড় ধরে বের করে দিতে পারেন প্রতিষ্ঠিত এক ধারাভাষ্যকারকে? সেই কবে যেন বলা হয়েছিলো,‘ক্রিকেট দ্য গ্লোরিয়াস আনসার্টেনটি’। না, এখন আর সেভাবে থাকার উপায় খোলা রইলো না। তার পরিবর্তে জায়গা করে নিলো,‘আমার দল, আমার টাকা, আমার জয়’। হার মানেই বিনিয়োগের চরম ক্ষতি, জিতলেই লাভের অঙ্ক গুনে নেওয়া দ্বিগুণ আকারে। মুনাফা ছাড়া বাকি সবিকছুর প্রবেশ প্রবলভাবে নিষিদ্ধ! এবং সবকিছুর ওপর শর্ত একটাই, মুখ বন্ধ করে দেখে যান কী হচ্ছে, কী হতে চলেছে। মুখ বন্ধ রাখার জন্যই না দেওয়া হচ্ছে এতো বিশাল অঙ্কের টাকা, তাও আবার বিদেশী মুদ্রায়। তারপর কথা কিসের?
...........................................................................................................
‘জানেন স্কিল এবং স্কোরবোর্ডকে বাদ দিলেও ক্রিকেটে রয়েছে এমনকিছু বিষয় যা এই খেলাটাকে আরো মোহময়ী করে তুলেছে। এক অদ্ভুত অবসর এবং শুদ্ধ বিনোদনের মেজাজ নিয়ে ক্রিকেট উপহার করে মানসিক প্রশান্তি। এক সুন্দর, হাল্কা তরঙ্গে ভেসে আসা সঙ্গীতের মতো যা ধীরে ধীরে সারাটা মন এবং শরীরকে ভরিয়ে দেয় অপার্থিব পরশে ঠিক যেমন আামার কাউন্টি ল্যাঙ্কাশায়ার খেলতো ক্রিকেট। অনেকেই হয়তো জানেন না তাই আজ চুপিচুপি সেই কথাটা বলে দেওয়া ভালো। এমনই এক মৃদুমন্থর ল্যাঙ্কাশায়ার দলের ব্যাটিং ইনিংসের ফাঁকে আমি সেরেছিলাম বিয়ে। কেন না জানতাম ওই কাজ সারার পরও মাঠে হাজির হলে দেখতে পাবো নিজের দলকে ব্যাট হাতে। ক্রিকেট সেই মসৃণতায় ভরা মাধুর্যে আজও সবার সেরা’।
এও কোন বানানো কথা নয়। বিশ্বক্রিকেট এখনও তাঁকে সম্মান জানাতে গিয়ে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করে না। সেই ব্যক্তিত্বের নাম নেভিল কার্ডাস। ধারাভাষ্যের পাশাপাশি ক্রিকেটীয় অসাধারণ সব নিবন্ধের গর্বিত লেখক এভাবএই ব্যক্ত করেছিলেন নিজস্ব আবেগকে। এখন অবশ্য তা নিয়ে ভাবতে গেলেও অবাক লাগে। মনে হয় কার্ডাস আদপে একজন আহাম্মকই ছিলেন! প্রতিমুহূর্তে চমক এবং প্রতিমুহূর্তে বিনিয়োগের দাঁড়িপাল্লায় যার তুল্যমূল্য বিচার করে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা হয় সেখানে ওই অলসতা মাখানো ক্রিকেটীয় রোমান্টিকতার স্থান কোথায়? নতুনদের নিয়ে বিপুল উৎসাহ, পুরানো হয়ে পড়া মানুষদের নিয়ে হরেক কাহিনী যাকে ‘ফোর্বস’ পত্রিকা ( জুলাই ২০০৮ সংখ্যা) বলছে,‘আবেগকে পুরোদস্তুর বিসর্জন দেওয়ার সময় আগত। এটা হলো গিয়ে বহজাতিকদের অবাধ মৃগয়াক্ষেত্র। যতো খুশি টাকা ঢালো, তুলে নাও কড়ায় গন্ডায় মুনাফার কড়ি। বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সমান্তরাল এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে এই বহুজাতিকরা তৈরি করে দিয়েছে এমন এক অর্থনীতি তার তল পাওয়া ভার অথচ তাই নির্ণয় করে দিচ্ছে ভবিষ্যৎ। এখন প্রতি সপ্তাহে কারুর দাম বাড়ে, কারুর আবার কমে।’ আর সেটাই এই প্রথমবার ভারতীয় ক্রিকেটের অন্দরে ধ্বনিত হলো সাড়ম্বরে। বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে একবার শুনে নিন ‘ওরা’ কী বলছেন!
শাহরুখ খান: ক্রিকেট নিয়ে যে বিরাট কিছু জানি তা আদৌ বলতে যাবো না।ওটা নিয়ে খুব একটা জ্ঞানও আমার নেই, খেলা ভালোবাসি এবং তারই টানে এই বিনিয়োগ। এও অস্বীকার করবো না ভারতীয় আর্থ-সামাজিক কাঠামোয় ক্রিকেট এমন এক শক্তপোক্ত জায়গা করে নিয়েছে যেখানে বিনিয়োগ করলে তার পুরোটাই উঠে আসসবে দ্বিগুণ আকারে।একটা বছর টাকা ঢালবো এবং তারপরেই সিদ্ধান্ত নেবো পরের বছর আমার কর্মপদ্ধতি কী দাঁড়াবে!
প্রীতি জিন্টা: ওটা আমার জানার আওতায় কোনদিনই ছিলো না। একবার আবদার করেছিলাম নেস ওয়াদিয়ার কাছে, এমনকিছু একটা উপহার দিতে যা কীনা বিশেষত্ব এবং মুনাফায় ভাসিয়ে দিয়ে যাবে সবকিছু। তো ওই বেছে দিলো এই ক্রিকেটকে। সত্যি বলতে, ক্রিকেট সম্পর্কে আমার জ্ঞানের বহর যদি জানতে চান তাহলে বলতেই হবে ওই চার এবং ছয় ছাড়া অন্যকিছুই আমার জানা নেই। মুনাফার দিকে নজর তো থাকবেই পাশাপাশি প্রচারের বাড়বাড়ন্তকে অস্বীকার করি কীভাবে! ওটাই আমাদের বেঁচে থাকার প্রধান হাতিয়ার এবং যারাই খেলবে আমার দলের হয়ে তাদেরকেও সাফ জানিয়ে দেবো, এই যে এতো টাকা লাগালাম তাকে আবার ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে ওদেরকেই। সেটা না হলে আর কিসের ক্রিকেট!
বিজয় মালিয়া: আমি চিরকালের ব্যবসাদার, বাজারের হালহকিকত বুঝে নিয়ে টাকা খাটিয়ে মুনাফা তোলাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। সুতরাং ক্রিকেটে যখন এভাবে টাকা খাটানোর সুযোগ এসেছে তখন হাত গুটিয়ে বসে থাকার প্রয়োজনই পড়ে না। মনে রাখবেন, টাকায় বাড়ে টাকা এবং সেই মন্ত্রে ভর করেই আমার এখানে আসা।
মুকেশ আম্বানি: মুম্বাই আমার প্রাণ এবং তারজন্য যদি বিনিয়োগ করে কিছু লাভ পাওয়া যায় তাহলে কেন নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখবো? টাকা লাগাবো, লোককে আনন্দ দেবো এবং তার হাত ধরে সুদে-আসলে তুলে নেবো লভ্যাংশের ভাগ। এখানে লজ্জার কী আছে!
তাহলে মোদ্দা ব্যাপার কী দাঁড়ালো? যারা কীনা রাতারাতি শচীন, সৌরভ, ধোনিদের নিলামের দাঁড়িপাল্লায় তুলে দিয়ে বেঁধে দিলো বাজারদর, তারা শুধুই বোঝে মুনাফা।কখনও ক্রিকেট, কখনও বা উষ্ণ পানীয়, আবার কখনও তার আকার রিয়াল এস্টেট! ভারতবর্ষের মতো দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার বাড়ে রক্তচাপ বাড়ার থেকেও দ্রুতগতিতে, অভাবের তাড়নায় খেটে খাওবা কৃষক বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। জাতপাতের ধুয়ো তুলে এক প্রদেশের মানুষজনকে ভিটেছাড়া করা হয় অবলীলায় আর তখনই বারো কোটি টাকার মূল্যের আকাশছোঁয়া ক্রিকেটের আয়োজন হয় কীভাবে? কোথা থেকে আআসে এতো পুঁজি? কিসের ভিত্তিতে ধোনির বাজারদর দাঁড়ায় ছ’কোটি? সবাই সব জানেন এবং তা জানেন বলেই মুখ ঘুরিয়ে বলেন অন্য কথা।
........................................................................................................
‘যদি ক্রিকেট খেলাটাকে ভালোবেসে থাকেন তাহলে দয়া করে তার সততা বজায় রাখার চেষ্টাও করবেন’। বাইশ গজের উইকেটের এ এক অতি পরিচিত এবং বহু প্রচলিত প্রবাদ। কথা হলো কে ভালোবাসেন? কাদেরই বা ‘সততা’ বজায় রাখার জন্য আহ্বান করা হচ্ছে? তাছাড়া আচমকা সততা বজায় রাখার প্রশ্নই বা উঠছে কেন? সত্যি বলতে, ওই প্রবাদ ধরে এগোতে থাকলে এভাবেই রাশি রাশি প্রশ্ন উঠে আসবে। আসতে বাধ্য এবং এও জেনে রাখবেন তার অধিকাংশেরই কোন জবাব নেই। বলা ভালো, কেউ তার জবাব দিতেই রাজি নন। এক অদ্ভুত উদাসীনতা ( পড়ুন অত্যন্ত সচেতনভাবে তাকে এড়িয়ে যাওয়া) নিয়ে প্রত্যেকে সবকিছু সোনেন তারপর নীরবে স্থানত্যাগ করে যান। কড়ি দেবো, বদলে মাখবো তেল, এটাই তো যুগ যুগ ধরে আকার নিয়েছে শাশ্বত সত্যের, ততবে কেন বাবা আজ ওই ‘সততা’ নামক শব্দকে হাজির করে বিড়ম্বনায় ফেলার প্রয়াস?
বহু আড়ম্বরে পালিত হয়ে গেলো ডন ব্র্যাডম্যানের জন্মশতবর্ষ কিন্তু সেটাই কী সব? ইন্টারনেট ঘাঁটতে ঘাঁটতে চোখে পড়লো এক বিচিত্র তথ্য। কুটামুন্দ্রার নীরব কুটিরে বসে জীবনের শেষ কটাদিন কাটানোর ফাঁকেই জীবনকে নিয়ে ভাবতে বসেছিলেন ডন। কী দিলেন! কীই বা পেলেন তার পরিবর্তে? বিশ্বক্রিকেটের অবিসংবাদী ব্যক্তিত্বকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো, ক্রিকেট কী দিলো আপনাকে? ডনের জবাব ছিলো এমন,‘আজ এই নীরবতায় বসে থাকতে থাকতে এটা ভেবে দারুণ লাগে এমন এক অধ্যায়ের সঙ্গে নিজের নাম যুক্ত রাখতে পারলাম যা কীনা সোনার চেয়েও অমূল্য। এক দুষ্প্রাপ্য স্মৃতি। এই ক্রিকেটেই ঘটলো ম্যাচ গড়াপেটার ঘটনা আবার এখানেই তো তৈরি হয়েছে এমনসব ইতিহাস যার কোনদিন কোন তুলনাই চলবে না। সেটাই কী কম পাওয়া হলো’! বেঁচে থাকলে আজ ডন কী পারতেন তেমনই এক যুক্তিতে অনড় থাকতে?
পাঠক বলবেন, কী দরকার রয়েছে এতো প্যাঁচ পয়জারের। এমনিতেই সমস্যায় জেরবার জীবন। চারপাশ জোড়া শুধু নেই আর নেই। সেখানে ওই একটু বিনোদনই তো পারে শান্তির প্রলেপ দিতে? নিশ্চয়ই, আপনি তা অনায়াসে বলতে পারেন। বলার পুরো হক রয়েছে আপনার কিন্তু বন্ধু তারই ফাঁকে একটু ভেবেও দেখবেন যা দেখলেন অথবা যা উপভোগ করলেন বলে গলা ফাটালেন তা কী নিছকই বিনোদন নাকি তার ভিতরে রয়েছে আরেক বাজারি ভয়ঙ্কর তত্ত্ব। ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় বহু অভিনবত্বের অন্যতম হলো দর্শকদের মনোরঞ্জন। যা খেলা হচ্ছে তা আদৌ বিনোদনমূলক কীনা তা জানার থেকে বাড়তি নজর দেওয়া হয়ে থাকে উপস্থিত দর্শক সংখ্যার ওপর। ওই ‘চিয়ারলিডার’দের কথাই ভাবা যাক। মাঠে খেলা হবে তারজন্য আলাদা করে স্বল্পবাস মহিলাদের উদ্দাম নৃত্যের কী প্রয়োজন পড়ে? কেউ বা স্বদেশীয়, কেউ আবার বিদেশ থেকে বহু টাকা খরচ করে তাদেরকে তুলে এনেছেন শুধুমাত্র দর্শকদের মন যোগাতে। ওরা নাচবেন, ওরা শরীরী ভাষায় হাজারো ভঙ্গিমা হাজির করে উত্তেজনার পারদকে বাড়িয়ে দেবেন দ্রুত হারে। সত্যি বলতে, আই পি এল যা দেখিয়ে দিয়ে গেলো তা সবদিক থেকেই নিপুণ এক পরিকল্পনার প্রকাশ। বুঁদ হয়ে যেতে হবে রাশি রাশি টাকার উড়ে যাওয়ার ছবি দেখতে দেখতে। তাই হয়েও গেলো ভারতীয় জনগণ। নিমেষে উড়ে গেলো আমজনতার পকেট থেকে মুঠো মুঠো পয়সা। মুখে রঙ, চোখে মাদকতার ছোঁয়া। আসলে ব্যবসার শর্তই তো ছিলো তাই। ক্রিকেটটা যেমনই হোক না কেন, সর্বদা এটা যেন মাথায় থাকে যারা বিনিয়োগ করছেন তারা যেন কখনোই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এবং পরিশেষে হিসাব কষে দেখা গেছে তাই-ই হয়েছে, বরঞ্চ যা ভাবা গেছিলো তার তুলনায় মুনাফার পরিমাণ তার তুলনায় অনেক বেশি। বাজারের চাহিদাই ছিলো এমনতরো। ইউরোপিয়ান ফুটবল পরিমণ্ডলের হাওয়া গায়ে লাগিয়ে ব্যক্তি মালিকানার অবাধ প্রবেশ এবং তার হাত ধরে উন্মুক্ত মুক্ত বাণিজ্যের পথ। বদলে গেলো ক্রিকেটের প্রথাগত ঘরানা, রুচি এবং রোজগার। সেখঅনে রোমান্টিকতা বলে আলাদাকিছুকে জায়গা ছেড়ে দেওয়ার অবকাশ রইলো না!
......................................................................................
আসুন দেখে ফেলা যাক কিছু অঙ্কের ধাঁধা।
৪৫ দিনে মোট ম্যাচ ৫৯। আট দলের লড়াই, প্রতিটি দল একে অপরের সঙ্গে খেলবে দু’বার করে। সেরা চার দল যাবে সেমিফাইনালে। মোট পুরস্কার মূল্য ১২ কোটি টাকা।
টাকার খেলা
মোট পুরস্কার মূল্য ১২ কোটি টাকা। বিজয়ী দল পাবে ৪.৮ কোটি টাকা, রানার্স পাবে ২.৪ কোটি টাকা।শেষ চারে উঠলেই ১.২ কোটি টাকা নিশ্চিত। পরবর্তী চারটি স্থানের দলের জন্য বরাদ্দ যথাক্রমে ৮০ লাখ, ৭০ লাখ, ৫০ লাখ এবং ৪০ লাখ টাকা। প্রতিযোগিতার সেরা পাবেন ১০ লাখ টাকা।
সেরা পাঁচ দামী ক্রিকেটার
মাহীন্দ্র সিং ধোনি, চেন্নাই, ৬ কোটি টাকা। অ্যান্ড্রু সাইমন্ডস, হায়দরাবাদ, ৫.৪ কোটি টাকা। সনথ জয়সূর্য, মুম্বাই, ৩.৯ কোটি টাকা। ইশান্ত শর্মা, কলকাতা, ৩.৮ কোটি টাকা। ইরফান পাঠান, মোহালি, ৩.৭ কোটি টাকা।
আট দলের মালিকানা এবং অর্থমূল্য
চেন্নাই সুপার কিঙস, ইন্ডিয়া সিমেন্ট লিমিটেড, ৩৬৪ কোটি টাকা। বাঙ্গালোর রয়াল চ্যালেঞ্জার্স, বিজয় মালিয়া/ইউ বি গ্রুপ, ৪৪৬ কোটি টাকা। মুম্বাই ইন্ডিয়ানস, মুকেশ আম্বানি/রিলায়েন্স গ্রুপ, ৪৪৮ কোটি টাকা। কলকাতা নাইট রাইডার্স, শাহরুখ খান/ রেড চিলিজ ইন্ডাস্ট্রিজ, ৩০০ কোটি টাকা। কিঙস ইলেভেন পাঞ্জাব, নেস ওয়াদিয়া-প্রীতি জিন্টা-করণ পল-মোহিত বর্ধন, ৩০০ কোটি টাকা। হায়দরাবাদ ডেকান চার্জারস, ডেকান ক্রনিকল, ৪২৮ কোটি টাকা। দিল্লি ডেয়ারডেভিলস, জি এম আর স্পোর্টস, ৩৩৬ কোটি টাকা।রাজস্থান রয়ালস, এমার্জিং মিডিয়া, ২৬৮ কোটি টাকা।
আসর শেষে মুনাফা
কলকাতা নাইট রাইডার্স: নিট মুনাফার পরিমাণ ৮ কোটি টাকা।
রাজস্থান রয়ালস: নিট মুনাফার পরিমাণ ৫ কোটি টাকা।
কিঙস ইলেভেন পাঞ্জাব: নিট লোকসান ৩.৪ কোটি টাকা।
চেন্নাই সুপার কিঙস: নিট লোকসান ৪ কোটি টাকা।
দিল্লি ডেয়ারডেভিলস: নিট লোকসান ৮ কোটি টাকা।
ডেকান চার্জারস: নিট লোকসান ২০ কোটি টাকা।
মুম্বাই ইন্ডিয়ানস: নটি লোকসান ২১ কোটি টাকা।
বাঙ্গালোর রয়াল চ্যালেঞ্জার্স: নিট লোকসান ৪৫ কোটি টাকা।
ভাবা যায়, একশো দশ কোটি জনসংখ্যা ছাড়িয়ে যাওয়া একটা দেশে নিছক বিনোদনের চেহারা এমন বিশালাকায়!স্বাধীনতার পরে পরেই প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু নাকি বলেছিলেন কালোবাজারীদের ধরে ধরে ঝুলিয়ে দেবেন লাইটপোস্টে! দেখতে দেখতে স্বাধীনতার বয়স ষাট পেরিয়ে যাওয়ার পরেও কিছু হলো না।স্বাধীন দেশে লাইটপোস্টের সংখ্যা প্রচুর পরিমাণে বাড়লেও সেখানে জায়গা তো হলো না কোন কালোবাজারীর। দিন-রাত দেখার পরেও তো চিহ্নিত করা গেলো না কারা রাতারাতি গড়ে তুলেছেন সমান্তরাল সাম্রাজ্য! খোলা বাজারে সবাই চলনসই, সবই চলে চাহিদার খিদে মেটাতে।ক্রিকেটকে ঘাটে তুলে দিয়ে তারই চিতার ওপর বিপুল আয়োজন বিপাশা, ঋত্বিক অথবা নয়নতারাদের মতো সুন্দর কিছু মুখের সারি। রাগী যুবক অক্ষয় কুমার হাতে ব্যাট নিয়ে অত্যাধুনিক আলো-আঁধারিতে এমন কসরত শুরু করলেন, দেখলে মনে হবে যেন পার্থের গনগনে উইকেটে বেদম প্রহার করছেন ম্যাকগ্রথ, লি’দের! প্রশন ছুঁড়ে দিলে জবাবও তৈরি,‘আমি তো সেই কবে থেকে ক্রিকেটর ভক্ত। তাছাড়া দিল্লির দল খেলবে আর আমি কীনা তাদের পাশে এসে দাঁড়াবো না!’ কী অপার প্রেম!
আবার সর্বাঙ্গ দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে ঋত্বিক রোশন বলে উঠলেন,‘দুনিয়া হিলা দেঙ্গে’।পাশে ছোট্ট এক ছেলে। এ কোন ছেলে? সেই ছেলেটা না যে কীনা বন্ধুর নতুন গাড়িতে করে বাড়ি ফেরে বেজার মুখে। ছোট্ট মুখের একরাশ হতাশাকে দেখে বাবা পরদিনই ছোটেন ‘শো-রুমে’ নতুন গাড়ি কিনতে এবং কোথায় যেন নিমেষে তৈরি হয়ে যায় এক দুর্বোধ্য চাহিদা! সেই ছেলেটা না যার রাগ ভাঙাতে মা’কে ছুটতে হয় ঝাঁ-চকচকে খেলনার দোকানে যেখানে থরে থরে সাজানো টেলিভিসনের সারি। দোকানের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা ঠাণ্ডা হাওয়া নিমেষে দূর করে দেয় যাবতীয় গ্লানি। নাকি ওই ছোট্ট মুখে লুকিয়ে একমুঠো ভাত না পাওয়ার অব্যক্ত বেদনা,‘আশ্চর্য ভাতের গন্ধ রাতের আকাশে,/কারা যেন আজো ভাত রাঁধে, ভাত বাড়ে, ভাত খায়।/আর আমরা জেগে থাকি আশ্চর্য ভাতের গন্ধে/ প্রার্থনায় সারা রাত’। কোন ছেলেকে দেখবো? আমরা আসলে কার মুখ খুঁজি বলুন তো!
সত্যি বলতে, আই পি এল তো ব্যবসা করে নিলো দুটো মূলসূত্রের ওপর দাঁড়িয়ে। একদিকে থাকবে বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞাপনের প্রয়োগ ঘটিয়ে মুনাফার জায়গা করে রাখা, অন্যদিকে টিকিট বিক্রি করে বাকি লভ্যাংশ ঘরে তুলে নিয়ে যাওয়া। বহুদন আগে এই তত্ত্বই তো আমাদের দেখিয়েছিলেন পল সুইজি এবং ব্যারন। একচেটিয়া পুঁজিবাদ নিজেই তৈরি করে নেয় সামাজিক এক চাহিদা এবং নিজেই তা পূরণ করার ব্যবস্থাও করে দেয়।আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে সবকিছুই তো ভালো চলছে অথচ ঘটনা আদৌ তা নয়।ভাবনাকে রাতারাতি অন্য এক জায়গায় প্রতিস্থাপন করে দেওয়ার খেলা চলতে থাকে সেই একচেটিয়া পুঁজিবাদের হাত ধরে। তৈরি হয়েছে জনসমর্থনের আলাদা আলাদা ক্ষেত্র, বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ গলা ফাটাচ্ছেন তাদের দলের হয়ে। কাদের দল? আমজনতা নাকি শাহরুখ-প্রীতির টাকায় কেনা বিজ্ঞাপনী প্রচারের? মিশে যাচ্ছে সংকীর্ণ এক আবেগ এবং তারই নির্যাসে জারিত হয়ে তৈরি হচ্ছে বিচিত্র এক আনুগত্যবোধ! বরঞ্চ আই পি এল এমনই এক খোলামেলা বিষয় যেখানে বিনিয়োগ এবং মুনাফার মধ্যে নেই কোন ছুঁতমার্গ। ভারতবর্ষের মতো দেশে নড়বড়ে আর্থ সামাজিক কাঠামোর ভিতর দাঁড়িয়ে থাকা বিভিন্ন স্তর থেকে উঠে আসা মানুষের মধ্যে ক্রিকেটর বাজারি চেহারাকে আরো একটু গভীরভাবে প্রোথিত করে দেওয়ার সেরা উপায় এই আই পি এল।
আর এটাই হলো বিশ্বক্রীড়ার কল্পজগতের সঙ্গে বাস্তবতার যথার্থ মিশ্রণ যেখানে বাজারের চাহিদাই এই নতুন তত্ত্বকে পরিণত করে দিলো দুরন্ত এক পরীক্ষার উপাদানে। ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কিছু মানুষের ইচ্ছা যে কী ভয়ঙ্কর আকার নিয়ে সবাইকে গিলে নিতে পারে, তা কী এই খেলা চালু না হলে অনুভব করা যেতো?বিবেক, বুদ্ধিকে বিসর্জন দিয়ে রঙিন আলোর নিচে অর্ধনগ্ন নারীদেহের বিভঙ্গরেখার স্বাদ নেওয়ারও তো আলাদা এক তৃপ্তি রয়েছে। প্রতি বলেই তো এখন মুনাফা। আপনার ইচ্ছা হোক বা নাই হোক শামিল হতে হবেই।
‘হোয়াট অ্যান আইডিয়া সারজী!’
Subscribe to:
Posts (Atom)
