Tuesday, January 26, 2010

violence in sports

আত্মঘাতী সবুজ সুষমা
ইন্দ্রনীল দত্ত
‘Serious sports has nothing to do with fair play. It is bound up with hatred, jealousy, boastfulness, disregard of all rules, and sadistic pleasure in witnessing violence: in other words it is war minus the shooting!’ - George Orwell

৩রা মার্চ, ২০০৯। সাতসকালেই যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার যোগাড়। তামাম বিশ্বের টেলিভিশন চ্যানেলের লক্ষ্য লাহোর। তামাম বিশ্বের ক্যামেরার সুক্ষ চোখ তখন একনাগাড়ে ঘুরে চলেছে ফুলের শহরের পাথুরে রাস্তায়।
বিশাল আকারের এক বাস দাঁড়িয়ে। জানলার কাঁচে গুলির বড়সড় সব ফুটো। একপাশ দিয়ে ছুটে চলেছে নিরাপত্তারক্ষীর দল। হাতে তাদের খোলা কালাসনিকভ।ঠিক উল্টোপ্রান্তে ক্যামেরা ঘুরতেই যেন আতঙ্কের হিমেল স্রোত নেমে গেলো মেরুদণ্ড দিয়ে। মুখে জড়ানো কালো কাপড়। জনাতিনেক অজ্ঞাতপরিচয় মানুষ একতরফা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে দৌড়াচ্ছে। বারুদ আর আগুনের ধোঁয়ায় চারপাশে কেমন যেন মৃত্যুরই আনাগোনা।
গদ্দাফি স্টেডিয়ামে যাওয়ার পথে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলের ওপর আচমকা নেমে আসা ভয়ঙ্কর এক সন্ত্রাসবাদী হামলা। একেবারে লাইভ টেলিকাস্ট! কারা,কেন এই ক্রিকেটারদেরই বেছে নিলো নিকেষ করার মতলব এঁটে তা জানার তখনও কোনরকম উপায় নেই।
ক্যামেরা আবার ঘুরছে।কংক্রিটের মসৃণ রাস্তায় পড়ে কিছু লাস।রক্তাক্ত,বীভৎস, খণ্ড হয়ে যাওয়া কিছু মাংসপিণ্ড। কাদের লাশ? কাঁপতে কাঁপতে টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিনিধিদের গলা থেকে বেরিয়ে আসছে যতোটুকু কথাবার্তা তার মর্মার্থ উদ্ধার করে জানা গেছে, রয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু অকুতোভয় জওয়ান যাঁরা কীনা জীবনের পরোয়া না করেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বিশ্বের সেরা ক্রিকেট তারকাদের প্রাণ বাঁচাতে, অথচ নিজেরাই হারিয়ে গেলেন মুহূর্তে! আবার রয়েছে কিছু নিরপরাধ আমজনতারও শরীরের খণ্ডাংশ। ওঁরা বোধহয় ঠিক হামলার মুহূর্তে নিজেকে বাঁচাতে শেষ চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু পারেননি গুলির গতিবেগের সঙ্গে পাল্লা দিতে। উগ্র হিংস্রতার শিকারে সবকিছু তালগোল পাকিয়ে একাকার!

মোনা রানার সঙ্গে পরিচয় ১৯৯৯ সালে। দীর্ঘ অনিশ্চয়তার জাল কেটে পাকিস্তান ক্রিকেট দল খেলতে এসেছে ভারতে। প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচ গোয়ালিয়রে। তো স্টেশনে পা রেখে চক্ষু চড়কগাছ। থিকথিক করছে পুলিস আর বিশেষ নিরাপত্তারক্ষী।থমথমে চোখমুখ, যেন দাঙ্গা বেঁধেছে গোটা শহর জুড়ে।ফিসফাস শব্দ আর হরেক গুঞ্জন। ক্যাপ্টেন রূপ সিং স্টেডিয়ামের পরিবেশ দেখলে ভয় যেন আরো চেপেই বসে। বিশালাকৃতি সব কুকুর দিয়ে চলছে জোরদার তল্লাশি, এবং তারপরেও শেষ হচ্ছে না তল্লাশি। সমস্ত জিনিসপত্র খুলে, ছুঁড়ে দিতে কসুর করছে না পুলিস। এমনই এক আবহে মোনার সঙ্গে আলাপ।
বয়স মধ্য তিরিশ, বি বি সি’র লাহোর সংবাদদাতা মোনারও সেই প্রথমবার ভারতে পা রাখা। মহিলা বলে ছাড় নেই। হয়তো বা ওয়াঘার ওপার থেকে আসার কারণে তল্লাশির মাত্রা একটু বেশিই। চোখমুখ ছলছলে,‘একটা সময় তো গোটা দেশটাই ছিলো অবিভক্ত। আর আজ সেটা দুটো টুকরো হয়ে যেতেই এতো বৈপরীত্য!’ অনেকটা সেই হিন্দি ছবির আবেগঘন মন্তব্যের মতো কানে বেজেছিলো মন্তব্যটা। যাই হোক, সেই প্রসঙ্গে দ্বিতীয়বার না ঢুকে ধীরে ধীরে বেড়েছে পরিচয়। দরকারেই টেলিফোন করে খবর যোগাড় করতে দ্বিধাবোধ হয়নি।
৩রা মার্চের সন্ধ্যায় আবার টেলিফোন লাহোরে। প্রায় আধঘন্টা চেষ্টার পর লাইন যখন মিললো মোনার গলায় অদ্ভুত এক আতঙ্কের ছায়া,‘দোস্ত, হামলোগ বরবাদ হো গয়ে’! ততোক্ষণে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়ে গেছে সেই হামলার পিছনে থাকা চক্রের নাম নিয়ে বিবিধ পর্যালোচনা। লস্কর ই তৈবা গোষ্ঠীর সক্রিয় আক্রমণেই শ্রীলঙ্কা দলটাই প্রায় মরতে বসেছিলো। মোনাকেও প্রশ্ন করে যে ব্যাখ্যা মিলেছিলো তা বহু পরিচিত বীজগণিতের ফর্মূলার মতো। অতীতে হরকত উল আনসার গোষ্ঠীর সঙ্গে এল টি টি ই’র ভালো সম্পর্ক ছিলো। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে টাইগাররাই এবার লস্করের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চালিয়েছে এই ভয়ঙ্কর হামলা।‘হামলোগ তো আপনে দেশমেই পরায়া বন গয়া। আপলোগ ক্যায়সে ভরোসা করোগে’! গত নভেম্বরের মুম্বাই হামলার ক্ষত দগদগে, ওদিকে প্রভাকরণ বনাম শ্রীলঙ্কা সেনার চলছে জীবন-মরণ যুদ্ধ। সবমিলিয়ে এমনই এক হামলার ছক বুঝতে গিয়ে মাথা ঘুরে যাওয়ার দশা। টেলিফোন রেখে দেওয়ার পরেও ওই কথাগুলো ক্রমাগত পাক খেয়ে গেলো মাথার ভিতর।‘আমরা তো নিজের দেশেই পরবাসী হয়ে গেলাম, আপনারা কীভাবে আমাদের ওপর ভরসা করতে পারেন’! কে ভরসা দেয়, কাকে দেয় অথবা কীই বা তার মর্মার্থ? বিশ্বায়িত এই দুনিয়ায় কোনকিছুই তো এখন আর নিজস্ব ইচ্ছা-অনিচ্ছার ধার ধারে না। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ অথবা কিছু বহুজাতিকের অথবা কিছু রাষ্ট্রনায়কের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অঙ্গুলিহেলনে প্রতিদিন এগিয়ে চলতে হয় একরাশ ভয় আর অজানা, অদেখা অন্ধকারকে সঙ্গী করে। কার যন্ত্রণা কে বহন করে বেড়াবে!
****************************************************
ভায়োলেন্স ইন স্পোর্টস। হ্যাঁ, এমনই এক বিষয় নিয়ে এখন চলছে জোর গবেষণা। না, এখন বলাটা বোধহয় ভুলই হবে। লাগামছাড়া পুঁজিবাদী দুনিয়ায় এমনই সব হিংস্রতার পালা দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। আজ আবার নতুন করে তার প্রকোপ সমাজবিজ্ঞানীদের বাধ্য করেছে সবকিছু। জটিল এক আবর্তে অন্ধের মতো ঘুরতে থাকা সামাজিক জীবনের অস্থিরতা ডানা মেলেছে খেলার দুনিয়াতে।নব আঙ্গিকে, নতুন কায়দায়।
ভায়োলেন্স। সোজাসাপটা এমনই এক ইংরাজি শব্দের যথার্থ আভিধানিক অর্থ খুঁজতে গেলে প্রচুর সমার্থক শব্দের আনাগোনা।যৎপরোনাস্তি প্রবলতা বা তীব্রতা, উগ্রতা, প্রচণ্ডতা, হিংস্রতা। তো এতো সমার্থক শব্দের ভিড়ে ওই হিংস্রতা শব্দটাই লাগসই। প্রবল এক আক্রোশে সবকিছু ভেঙে পড়ার পরিস্থিতি। শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ক্রিস গ্র্যাটনের ভাষায় বলতে গেলে,‘সেই ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের ভবিষ্যৎ বিচার করার কাজ এইমুহূর্তে খুব কঠিন এক কাজ এবং পরিস্থিতি ক্রমে যেখানে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে তারপর আশার আলো দেখাই যাচ্ছে না। যাবে বলেও মনে হয় না’।
১৯৭২ মিউনিখ ওলিম্পিকের নারকীয়তা অথবা ১৯৯৬ আটলান্টা ওলিম্পিকের আসরে আচমকা বোমা বিস্ফোরণ। এসবই জানা সচেতন পাঠককূলের। অথবা অনেক, অনেকখানি পিছিয়ে গিয়ে সেই ১৯৩৮ সালের বার্লিন ওলিম্পিকের আসর। জেসি ওয়েন্সের সোনা জয়, হিটলারের সামনে মাথা নত করে নাৎসী কায়দায় স্যালুট ইংল্যান্ড ফুটবল দলের। এটাও খুব পরিচিত পাঠকের কাছে। এবং মজার ব্যাপার, সেই খেলার জগতের হিংস্রতা বা উগ্রতার প্রকাশ এমনই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক অস্থিরতারই বহিঃপ্রকাশ। একুশ শতকে শুধু তার প্রতিফলনের ধারায় এসেছে পরিবর্তন, বদলে গেছে নারকীয়তার সংজ্ঞা। ফুটে উঠেছে হরেক বিপন্নতা। মাইকেল এটকিনসনের অতি জনপ্রিয় বই ‘ডেভিয়ান্স অ্যান্ড সোশ্যাল কন্ট্রোল ইন স্পোর্টস’য়ের মুখবন্ধে লেখা হচ্ছে,‘নিরঙ্কুশ খোলাবাজারে পুঁজিবাদের যবনিকার মুহূর্তে যে আঁধার নেমেছে তাকে দূর করতে ওই হত্যালীলাই পারে রাক্ষসগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে। ফলে যা হচ্ছে তাকে নেহাতই একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দিয়ে রাতে শান্তিতে ঘুমাতে যাওয়া কিন্তু চরম বোকামিই হয়ে দাঁড়াচ্ছে।মনে রাখবেন, ঘুমের ঘোরেও যে স্বপ্নের উদয় ঘটছে সেখানেই বেরিয়ে পড়ছে আমাদের মতো মানুষদের আসল বিপন্নতা’।চলুন একটু অন্যদিকে মুখ ঘোরানো যাক!
****************************************************
দয়া করে খেলার সঙ্গে রাজনীতিকে জড়িয়ে ফেলবেন না।
বহু পরিচিত এ এক সহজ, সরল ব্যাখ্যা। পাণ্ডিত্য অথবা অজ্ঞানতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার দরকার নেই এমন এক উক্তিকে। একেবারেই ছা-পোষা কথা বলে ধরা যেতে পারে। ঠিকই তো! রাজনীতির ছড়িয়ে অথবা জড়িয়ে পড়ার আরো অনেক উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ রয়েছে, কাজেই খেলার জগতে তাকে ধরেবেঁধে আনার প্রয়োজনটাই বা কী!কিন্তু একটু নির্জনে গিয়ে নতুনভাবে এমনই নির্বিষ মন্তব্যের অর্থ খুঁজতে বসলে সত্যিই কী আপনি এতোটা খোলামেলা মানসিকতা নিয়ে অতি সরলীকরণের পথে হাঁটতে পারবেন?
সম্ভবত না। হ্যাঁ, সচেতনভাবেই সম্ভবত শব্দ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এই দুনিয়ায় এমন মানুষের সংখ্যাও তো নেহাৎ কম নয় যাঁরা অনায়াসে মুহূর্তের ভিতর দিয়ে দিতে পারেন এমন এক দুর্বোধ্য বিশ্লেষণ যা দেখে এবং শুনে জুটে যায় বড়সড় জনসমর্থনও। অথচ তার বাইরে যে বিরাট পরিধি রয়েছে এবং সেখানে অহরহ যা ঘটেছে এবং ঘটে চলেছে, সেই সুদীর্ঘ ধারাবাহিক এক বিচিত্র প্রক্রিয়ারই প্রতিফলন ঘটেছে আজকের সেই হিংস্রতায়। গত শতকের শেষ কয়েকটি বছরে খেলার গুরুত্ব লাফ দিয়ে বেড়ে যাওয়াকে বিশ্বায়নের বড়সড় সাফল্য বলেই প্রচার করা হয়েছিলো। তেমনই এক জয়ের মাহাত্ম্যকে খুব বড় আকারে তুলে ধরা হলেও কেউ তো সেভাবে খতিয়ে দেখলেনই না!
হয়তো বা ধানের হাটে পানের বোল বলে মনে হতে পারে কিন্তু সেই গল্পটা কেমন যেন প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। প্রাচীন গ্রীসের একটি স্থান, নাম রোডস। সেই রোডসের অ্যাথলিট ছিলেন ডায়াগোরাস। যৌবন ডায়াগোরাস ওলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। তারপর একদিন ডায়াগোরাসের জীবদ্দশাতেই তাঁর দুই পুত্র পেলেন ওলিম্পিক পুরস্কার। সেই সময়ে ওলিম্পিক পুরস্কারের অর্থ ছিলো ওলিভ বা জলপাই পাতার মুকুট। সেই মুকুট তাঁরা বাবার মাথায় পরিয়ে দেন। দর্শকরাও ডায়াগোরাসকে ফুলের মালায় বরণ করে বলেছিলেন,‘এই জীবনে এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে না’! বিষয়টা হলো এই, এমন এক পবিত্র ভাবধারাকে আঁকড়ে ধরে যে চেতনা তৈরি হয়েছিলো সবার মনে এবং প্রত্যেকে তাকেই অনুসরণ করে রচনা করেছিলেন সুন্দর অধ্যায়, তা আর সেই গতি পেলো কৈ যা দিয়ে অনায়াসে থামিয়ে দেওয়া যেতে পারতো নারকীয়তায় ভরা আতঙ্কের ভয়াবহ ছবিগুলোকে।অ্যামেচারিজমকে রাতারাতি নস্যাৎ করে দিয়ে পেশাদারিত্বের মোড়কে যে বস্তু তুলে দেওয়া হলো হাতে তা আসলে বিকৃত কিছু ভাবধারার দুর্বোধ্য তত্ত্ব। দেশকে ভালোবাসা অথবা দেশাত্ববোধ নামক পরিশীলিত চিন্তার জগতকে ঢাল বানিয়ে পিছন থেকে চালু হয়ে গেলো ভোগবাদী ধ্যানধারণাকে ক্রমে উসকে দেওয়ার কাজ।
এটকিনসন সেই পুরো ব্যাপারকেই সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানাচ্ছেন, এই যে প্রতিহিংসাসূচক উগ্রতার জন্ম হয়েছে তাকে দিনের পর দিন লালন করেছে এমন কিছু তত্ত্ব যার সঙ্গে আমজনতার ছিলো না আদৌ কোন পরিচয় অথচ সেই সেই বিপুল সাধারণ জনতার মগজে সুক্ষভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে কখনও হিংসার ভাব, আবার কখনও সেই জায়গার দখল নিয়েছে আজগুবি সংস্কৃতি, অস্তিত্বরক্ষার অহেতুক তাগিদ বা বঞ্চনার মনগড়া কাহিনীকে। সেই বিচিত্র মিশেলে মানুষের মনে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছে প্রতিশোধের মানসিকতা। হিটলার তার বিবর্ণ অতীতকে ভুলতেই না নরখাদকের চেহারা ধারণ করেছিলো ইহুদি নিধনের মাধ্যমে এবং সেই পৈশাচিক কাণ্ডকারাখানাকে আরো মজবুত করতে ওলিম্পিকের মতো আসরকেও ছেড়ে কথা বলেনি। বলা যায়, সেই একপেশে ধারা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে গেছে খুব সহজেই।ঠিক যেমনটা মুসোলিনি অথবা ফ্রাঙ্কো অথবা লাতিন দুনিয়ার দেশগুলিতে বিশেষ করে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত স্বৈরাচারী শাসকদের ভয়ঙ্কর অত্যাচার এবং তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে চামড়ার গোলককেই সেরা মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একদিকে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের নব কলেবরে উন্মেষ,অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুবৃহৎ আস্ফালন। রাজনীতি, সমাজনীতির পাশাপাশি ক্রীড়াক্ষেত্রেও লাগলো তার ধাক্কা। একটু তলিয়ে দেখতে গেলে পুঁজিবাদের বিকাশই তো ঘটেছে এক অদ্ভুত স্ববিরোধী পদ্ধতিতে।ঊনবিংশ শতাব্দীতে পৃথক জাতিভিত্তিক যে রাষ্ট্রগুলি গড়ে উঠেছিলো, সেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে থেকেই উঠে আসে পুঁজিবাদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মার্কিন আস্ফালন খেলার মাঠে যে প্রভাব ফেলে তার রেশ হয়ে দাঁড়ায় সুদূরপ্রসারী। খেলাধূলাকে মূলধন বানিয়ে পুঁজি এবার জাতি এবং রাষ্ট্রের সীমানা অতিক্রম করার কাজ শুরু করে দেয়। বিনিয়োগ এবং ব্যবসা বাণিজ্যের অগ্রসরের মাধ্যমে সৃষ্টি বহুজাতিক সংস্থার। ঢালো টাকা, লুটে নাও মুনাফা, একেবারে জলের মতো সরল সেই নীতি চালুকরে দিয়ে যে বিষবৃক্ষ বপন করা হলো তাই ফুলে ফলে সমৃদ্ধ হয়ে এখন একে অপরের ঘোর শত্রুপক্ষে পরিণত।‘পুঁজি এবং সাধারণভাবে অর্থনৈতিক জীবনের আন্তর্জাতি ঐক্য’ গড়ে তোলার স্লোগানকে সামনে রেখে রাষ্ট্রীয় বেড়াজাল ভেঙে বাতাসে ছড়িয়ে পড়লো বারুদ আর সুযোগ পেলেই প্রতিপক্ষকে যে কোন উপায়ে নিকেশ করে দেওয়ার মারণমন্ত্র!
****************************************************
যে জয়ী তাকে নিয়ে উন্মাদনা তো চিরকালীন এক সহজাত প্রবৃত্তি।কিন্তু পরাস্ত মানুষগুলোর কথা কে ভাববেন? যারা হারলেন তাঁরা কী তবে খেলাকে কোনদিনই ভালোবাসেননি অথবা পরাজয়ের গ্লানি তাঁদের সেই ভালোবাসার জায়গাকেই নষ্ট করে দিয়েছে?এটা ভাবা দুষ্কর হয়ে গেছে যে, এই খেলা মানবসভ্যতার শৈশব থেকেই রয়েছে। বিস্মৃত হতে হয় যে খেলা হলো মানব দেহমনের সঙ্গে বল, ব্যাট অথবা অন্যান্য ক্রীড়া উপকরণের স্বতঃস্ফূর্ত এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ আদান প্রদান।
মজার ব্যাপার, বর্তমান অরর্থনীতির ধারক এবং বাহক এবং নিয়ন্ত্রকদের খুব পছন্দের একটা কথা রয়েছে। তাকে বলা হয়ে থাকে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’। সোজা বাংলায় বলতে গেলে সবরকম বিধিনিষেধ তুলে নিতে হবে। জলাঞ্জলি দিতে হবে যাবতীয় নিয়ন্ত্রণ, সরকারী কোন বিষয়কে কোনভাবেই দেওয়া যাবে না খুব একটা স্বীকৃতি। পুঁজিপতিদের বেড়ে ওঠার জন্য চাই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। তো তেমন একটা ব্যবস্থা চালু করলে কী লাভ পাওয়া যেতে পারে? মাইক মার্কুইজি বলছেন,‘সেটাই তো একটা সমাজে জন্ম দেয় বিকৃত মানসিকতার যা সরকারী নিয়ন্ত্রণে থাকলে কখনই সম্ভব নয়’। আন্তর্জাতিক লগ্নী পুঁজির জোরাজুরিতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ধারণা সব দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। এবং সেই পুঁজির ঠেলায় মূল আদর্শ থেকে সরে এসে উদ্ভট জাতীয়তাবাদ অথবা পাশের লোককে রাতারাতি শত্রু বানিয়ে ফেলে নিকেশ করে ফেলার ব্যবস্থা করে ফেলা নিছল মামুলি বিষয়ে পরিণত। তবে যে কাণ্ড ঘটছে চিলিতে অথবা রাওয়ান্ডায় তার আকার কিন্তু এক নয় এশীয় দেশগুলিতে। ভৌগলিক ব্যবধানের কারণে সামাজিক, আর্থিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে যে পরিবর্তন রয়েছে তার সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই তৈরি হয়েছে হরেক পরিকল্পনা।
প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন বার্নেস বোধহয় সঠিক মন্তব্যই করেছিলেন। তাঁর উক্তি ছিলো,‘যেদিন থেকে খেলার মধ্যে জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর চল শুরু হলো, সেদিন থেকেই রাজনীতি, জাতীয়তাবোধ নামক শব্দগুলো আমজনতা এবং ক্রীড়াব্যক্তিত্বদের দিগভ্রান্ত করার কাজও শুরু করে দেয়’। নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা গতবছর এক প্রতিবেদনে লিখেছে, অর্থনিতিক উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করার ফলে বিশ্বায়নপন্থীদের পক্ষে দৃষ্টিভঙ্গির লক্ষ্য বদলে দেওয়ার কাজ অনেক সহজ হয়ে গেছে। ঠিক সেকারণেই কিউবার বক্সারদের সঙ্গে মুষ্ঠিযুদ্ধ অথবা বেসবল ম্যাচ থাকলেই স্বশরীরে হাজির থাকতেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশ। কিউবাকে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অবরোধের পাকেচক্রে বেঁধে ফেলেও কবজা করা যায়নি। সেই ব্যর্থতাকে ডাকা দিতে বুশ চিরকাল কাস্ত্রোর দেশের প্রতিযোগীদের ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা সদম্ভে প্রচার করে গেছেন, একই অবস্থানে দাঁড়িয়ে কাস্ত্রোও চালিয়েছেন প্রচার।
কোনটা ঠিক অথবা কোনটাই বা বেঠিক, তা ভেবে দেখার দরকার পড়ে বৈকি! বিশেষ করে যখন একটা গোটা দেশের সামগ্রিক আবেগকে কাজে লাগিয়ে তার মাধ্যমে ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যসাধনের পরিকল্পনা প্রকট হয়ে পড়ে, তারপর চুপ করে বসে থাকার ভিতর খুব একটা বুদ্ধির পরিচয় রয়েছে বলে তো মনে হয় না। মিলিয়ে নিন তাহলে কয়েকটা তথ্য।
যুগোস্লাভিয়ার রেড স্টার বেলগ্রেদের নাম বিশ্বজোড়া।কিন্তু সেই জনপ্রিয়তার পিছনে রয়েছে আরো এক লুকানো তথ্য। সমাজতান্ত্রিক মারশাল টিটোর সময়কার ক্লাব তো রাতারাতি এখন খুল্লমখুল্লা সার্বিয়ার উগ্রবাদের জোরালো সমর্থকে ভর্তি এবং ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে ম্যাচ থাকলে তো কথাই নেই। সবকিছু ভুলে গিয়ে নারকীয়তায় মেতে উঠতে লাগে না একমুহূর্ত সময় নষ্ট করতে। অথবা ধরা যাক এইমুহূর্তে বিশ্বফুটবলে আলোড়ন ফেলে দেওয়া রিয়াল মাদ্রিদের কথা। ফ্রাঙ্কোর অত্যন্ত প্রিয় ক্লাব রিয়াল প্রথম থেকেই স্প্যানিশ সুপারম্যান তৈরি করার প্রক্রিয়ায় অতিমাত্রায় উৎসাহী এবং সেই উদ্দেশ্য সাধন রতে গিয়ে বলি হয়েছেন নিরপরাধ ক্যাটালান সম্প্রদায়ের মানুষজন। একই দেশের ভিতর দুই জাতিসত্তার অস্তিত্ব জাহির করার অসম লড়াই। বাধ্য হয়ে জন্ম বার্সেলোনার। ক্যাটালানদের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতিীক বার্সেলোনার পিছনে প্রত্যক্ষ মদত রয়েছে সন্ত্রাসবাদী চক্র ই টি এ(ইসকাদি টা আসকাটাসুনা)। ১৯৫৯ সালে জন্ম নেওয়া এই সন্ত্রাসবাদী চক্রের মূল লক্ষ্যই হলো পৃথক বস্ক কাউন্টি গড়ে তোলা। গ্লাসগো রেঞ্জার্স এবং গ্লাসগো সেল্টিক ক্লাবের ইতিহাস তো আরো ভয়ঙ্কর। একে অপরের ছায়া দেখলে রে রে করে তেড়ে যায় সমর্থকরা। উত্তর আয়ার্ল্যান্ডের গ্লাসগো রেঞ্জার্স কোনদিনই স্বীকার করেনা ব্রিটিশ সরকারকে এবং সেই ঘৃণাকে জাগিয়ে রাখতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এণ আই এক্সট্রিমিস্ট গ্রুপ, আর সেল্টিককে ভিছন থেকে সহায়তা দিয়ে চলেছে আই আর এ নামক আরেকটি সংস্থা। আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি নামক এই সন্ত্রাসবাদী সংস্থার জন্ম ব্রিটিশ ক্যাথলিকদের চরম বিরোধিতার মধ্যে দিয়ে এবং এখনও তাদের বাড়বাড়ন্ত রীতিমতো আতঙ্কের কারণে পরিণত আয়ার্ল্যান্ড সরকারের।
এগুলো হয়তো বা টুকরো কিছু উদাহরণ কিন্তু এভাবেই বিশ্ব ক্রীড়াজগতে বাসা বেঁধেছে উগ্রতা। বিশ্বাকপ জয় করলে ফায়দা তোলেন রিকার্ডো টেক্সেইরার মতো লোক। ব্রাজিল ফুটবল কনফডারেশনের সভাপতি টেক্সেইরার বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক অপরাধমূল অভিযোগ, তবু তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে। ওই একেকটা বিশ্বকাপ তাঁকে তুলে নিয়ে যায় উচ্চ শিখরে। সিলভিও বের্লুসকোনির কথাও ধরা যেতে পারে। দেশের সবথেকে ধনশালী ব্যক্তি বের্লুসকোনির মোট সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৮০ কোটি ডলার।খেলাধলা নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত পাগল ইতালি জনতার আবেগ ব্যবহার করে এ যুগের মুসোলিনির ভূমিকায় এ সি মিলানের সর্বোময় কর্তা যিনি জোরগলায় ঘোষণা করে দেন ‘ফোর্জা ইতালিয়া’। নতুন করে ফ্যাসিস্ত দর্শনকে চাঙ্গা এবং তরুণ প্রজন্মের ভিতর ঢুকিয়ে দিতে বের্লুসকোনির এমনই ভূমিকা নিয়ে বাকিরা একেবারে নীরব! অথবা সেই ফরাসী রাষ্ট্রপতি জাঁক শিরাক যিনি কীনা নির্বাচনী বৈতরণী পার হত বেছে নিলেন জিনেদিন জিদানের মতো মানুষকে। দেশের ঐক্য এবং সংহতির স্বার্থে আমজনতাকে একসূত্রে বাঁধার সেরা মাধ্যম জিদান, আর বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা নিও নাৎসি প্রার্থী জাঁ ল পেঁ ক্ষমতায় এলেই অভিবাসী এবং আলজেরিয়া জাত মানুষদের দেশছাড়া করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নামেন!
অথবা আমাদের দেশের কথাই যদি তোলা যায় তবে সেই বহুচর্চিত ভারত-পাক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন এক চরম দুঃস্বপ্ন। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, যে কোন প্রতিপক্ষের কাছে হার একশো শতাংশ ‘স্পোর্টিং’, কিন্তু পাকিস্তানের কাছে হারলেই সবকিছু রসাতলে যাওয়ার জোগাড়। রাতে ঘুম নেই, পাড়ার রকে খেলোয়াড়দের বাপান্ত করার তুখোড় প্রতিযোগিতা।ঠিক যেমন প্রতিবেশীকে হারতে পারলে যেন গোটা দুনিয়া জয়ের উল্লাস। পারলে মুসলিম মহল্লায় গিয়ে ছোটখাটো একটা হামলা বাধিয়ে দিলেও মন্দ হয় না! তখন ওই ‘স্পোর্টিং’ শব্দ রাতারাতি উধাও। অবচেতন মনে লুকিয়ে থাকা হিংস্রতা দাঁত-নখ বের করে তখন শুধু খুঁজে বেড়ায় প্রতিপক্ষকে বিক্ষত করতে। ঘরে ফিরে সেই এক ক্লান্তিকর অথচ নির্মম এক ভবিষ্যতের সঙ্কেত!
এমনই সব ঘটনা অথবা তথ্যসামগ্রী আমাদের কেমন যেন এক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রশ্নটা খেলাধূলার নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিষয়ক। যে চশমা চোখে লাগিয়ে আমরা সবকিছুকে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি সেটাও সঠিক কীনা, তা নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। সবকিছুতেই বাণিজ্যিক চাপ এবং স্বার্থের সঙ্ঘাত মাথাচাড়া দিতে দিতে এমন এক উচ্চতা ছুঁয়েছে তারপর তৈরি হয়েছে বিশ্বাসযোগ্যতার চরম সংকট। চোখের আড়ালে মাকড়শার মতো জাল বুনে চলেছে কোম্পানি-মিডিয়া চক্র। চাই দুর্দান্ত একটা পণ্য যাকে বাজরে ছেড়ে খুব সহজে বিক্রি করে দেওয়া যায়। মানবচরিত্রের অসরলরৈখিক, প্রতিসারী গুণগুলোকে ছেঁটে ফেলে সমস্তকিছুকে পরিণত করে ফেলা একটা ব্র্যান্ডে। সেই ব্র্যান্ড তৈরি করবে প্রবল উত্তেজনা, তৈরি করবে মারমুখী এক প্রতিযোগিতা, সাধারণ মানুষকে রাক্ষস বানিয়ে লেলিয়ে দেবে পাশের লোককে গিলে ফেলতে। কখনও সেই চেহারাটা সন্ত্রাসবাদীর, কখনও তার অবয়ব বহুজাতিকের লোলুপ হাতছানির। কী আছে সেই খেলার সার্থকতা যেখানে কীনা একটু রক্ত ঝরবে না, রাষ্ট্রনায়করা নিজস্ব আসন শক্ত রাখতে একটা গোটা জনশক্তিকে খেপিয়ে দিতে পারবে না! সম্পদের অসম বন্টন খেলার দুনিয়ার ভারসাম্যই একেবারে শেষ করে দিয়েছে।
বিশ্বায়নের মাঠে কেমন যেন আত্মঘাতীই হয়ে গেলো সবুজ ঘাসের সুষমা!

No comments:

Post a Comment